
ইন্দোনেশিয়ার আনাক ক্রাকাতাউ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের প্রভাবে ভয়াবহভাবে ব্যাহত হয়েছে দেশটির বিমান চলাচল। আগ্নেয়গিরির ছাই ছড়িয়ে পড়ায় আটটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের ৭১২টি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় দেড় লাখের বেশি যাত্রী বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজধানী জাকার্তার সুকর্ণো-হাট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রথমে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরিবহনমন্ত্রী ডুডি পুরওয়াগান্ধি জানিয়েছেন, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের কারণে এখন পর্যন্ত ৭১২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু ফ্লাইট বিকল্প বিমানবন্দরে স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করতে বিমান সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে আনাক ক্রাকাতাউতে অগ্নুৎপাত শুরু হয়। এরপর থেকে সেখানে একটানা ভূকম্পন ও লাভা উদ্গিরণ হতে থাকে। আশপাশের এলাকাগুলোতে এ সময় তীব্র গর্জনও শোনা যায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোববার ভোরে আগ্নেয়গিরিটিতে আরও দুবার অগ্নুৎপাত হয়েছে।
পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত থাকায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সিঙ্গাপুর থেকে আসা ও সিঙ্গাপুরগামী ফ্লাইটে। পাশাপাশি দোহা, সিডনি ও কুয়ালালামপুরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটও বাতিল বা ব্যাহত হয়েছে।
পুরওয়াগান্ধি বলেন, আগ্নেয়গিরির ছাই পশ্চিম জাভার দিকে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার পর আরও কয়েকটি বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফ্লাইট বাতিলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের টিকিটের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে বিমান সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বিমানবন্দরে অযথা ভিড় এড়াতে যাত্রীদের সময়মতো ফ্লাইটসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছেন।
ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া সংস্থা বিএমকেজির তথ্য বলছে, আগ্নেয়গিরির পূর্ব দিকে জাভা দ্বীপের আকাশে ছাই প্রায় ২০ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছেছে। অন্যদিকে পশ্চিম দিকে সুমাত্রা দ্বীপের ওপর ছাইয়ের স্তর উঠেছে প্রায় ৫০ হাজার ফুট পর্যন্ত।
জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মাঝের সুন্দা প্রণালীতে অবস্থিত আনাক ক্রাকাতাউয়ের সাম্প্রতিক অগ্নুৎপাতের সঙ্গে সুনামির কোনো ঝুঁকি নেই বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। আগ্নেয়গিরির ছাই থেকে শ্বাসতন্ত্র, চোখ ও ত্বকের সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে সবাইকে মাস্ক ব্যবহারের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সংবাদপত্র ‘কমপাস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের কারণে চোখে জ্বালাপোড়ার অভিযোগ পাওয়ার পর শনিবার কয়েকটি স্কুলের কার্যক্রম বাতিল করা হয়। একই কারণে চোখে ব্যথা হওয়ায় অনেক জেলেও সাগরে মাছ ধরতে যাননি।
‘আনাক ক্রাকাতাও’ নামের অর্থ ‘ক্রাকাতাও-এর সন্তান’। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সমুদ্র থেকে জেগে ওঠার পর থেকে আগ্নেয়গিরিটি মাঝেমধ্যেই সক্রিয় হয়ে উঠছে। ১৮৮৩ সালে মাউন্ট ক্রাকাতাওয়ের ভয়াবহ অগ্নুৎপাতের ফলে সৃষ্ট বিশাল ক্যালডেরার মধ্যেই আনাক ক্রাকাতাওয়ের জন্ম হয়।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আনাক ক্রাকাতাওয়ের একটি অংশ ধসে পড়ে। এর ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ সুনামিতে ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত হন। একই ঘটনায় সুমাত্রা ও জাভার উপকূলীয় এলাকায় হাজার হাজার মানুষ আহত ও বাস্তুচ্যুত হন।
বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ধসের সময় আগ্নেয়গিরি থেকে ছিটকে পড়া পাথরের কিছু খণ্ডের উচ্চতা ছিল প্রায় ৭০ থেকে ৯০ মিটার।
আনাক ক্রাকাতাও ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’-এর অন্তর্ভুক্ত। প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে থাকা আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল এবং টেকটোনিক প্লেটের বিস্তৃত বলয়কে ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’ বলা হয়। দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্ত থেকে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বলয়।
বিশ্বের মোট ভূমিকম্পের প্রায় ৯০ শতাংশ এই অঞ্চলে ঘটে। একই সঙ্গে পৃথিবীর সক্রিয় আগ্নেয়গিরির প্রায় ৭৫ শতাংশ—অর্থাৎ ৪৫২টি—এই বলয়ের মধ্যে অবস্থিত।
সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স।