আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নারী বিদ্বেষ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং প্রার্থীদের লক্ষ্য করে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর মতো গুরুতর ইস্যুগুলো নিয়ন্ত্রণে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কার্যকর উপস্থিতি চোখে পড়ছে না—এমন অভিযোগ তুলেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য মুক্ত আলোচনা: ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সতর্ক করে বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বড় ধরনের নৈরাজ্যমূলক বিশৃঙ্খলা ও সামাজিক বিভাজনের উৎস হয়ে উঠতে পারে। এর লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সরকার, নির্বাচন কমিশন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সচেতনতা বা কার্যকর উদ্যোগ আমি এখনো দেখতে পাচ্ছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও এগুলো নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ, সক্ষমতা কিংবা সদিচ্ছার প্রতিফলন নেই। নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর মতো বিষয়গুলোতে সরকার বা নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা অনুপস্থিত। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কিছু সীমিত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেগুলো বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা ও বিদ্বেষ ছড়ানো নিয়ে গত ডিসেম্বর সরকার মেটাকে চিঠি পাঠানোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এটি সঠিক পদক্ষেপ। তবে মেটার বাংলাদেশে কোনো অফিস নেই এবং ভাষাগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তবু রাজনৈতিক সহিংসতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা নিয়ন্ত্রণে এ ক্ষেত্রে আরও জোরালো উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহারের সুযোগও কাজে লাগানো হয়নি। তিনি বলেন, ‘ভোটার তালিকা, ভোটকেন্দ্র, অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া কিংবা ভোট গণনার স্বচ্ছতা—এসব বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য দেওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু সেটি করা হয়নি। উদ্বেগ এতটাই গভীর যে নাগরিকেরা দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। একই সঙ্গে তারা এটাও জানেন, গণতন্ত্র ছাড়া নিয়ন্ত্রণ বিপজ্জনক হতে পারে—নেপালের অভিজ্ঞতা সেটিই দেখায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশৃঙ্খলা ও ডিজিটাল সুরক্ষা আইন নিয়ে নাগরিকদের উদ্বেগগুলো আরও শক্তভাবে সরকারের কাছে তুলতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চান, তাদের কাছেও এই দাবি জোরালোভাবে জানাতে হবে। এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ২০২৪ সালের আগস্টের মতো আবার দেশ ছাড়ার ঘটনা ঘটতে পারে।’
সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে অংশ নেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহিদ এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলীলী।
এ ছাড়া আলোচনায় বক্তব্য দেন ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান সবুর খান, বারভিডার সাবেক সভাপতি আবদুল হক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল, ঢাকা চেম্বারের (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, সিটি ব্যাংকের অ্যাসোসিয়েট রিলেশনশিপ ম্যানেজার তানহা কেট, উদ্যোক্তা আবিদা সুলতানা ও তাজমিন নাসরিন এবং সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী।
আলোচকরা বলেন, বাংলাদেশে ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও নীতিগত অস্পষ্টতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, উচ্চ ব্যান্ডউইথ ব্যয়, ডিজিটাল বৈষম্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে জবাবদিহির অভাবসহ নানা চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।
অনুষ্ঠানে জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, রাজনীতি কিংবা গণতন্ত্র—কোনোটির জন্যই সহায়ক নয়। আমরা যে মেরুকরণ ও বিভাজনের রাজনীতি দেখছি, রাষ্ট্র নিজেই তা পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সহিষ্ণুতা ও সহমর্মিতার কথা আমরা বললেও বাস্তবে বাংলাদেশ সেখান থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। এসব সংকট মোকাবিলা করতে না পারলে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হলেও প্রকৃত মুক্তি মিলবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যায়।’