
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে। বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর দলটির ভেতরে নেতৃত্ব সংকট, অন্তর্কোন্দল এবং গোষ্ঠী বিভাজনের আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ দলটির সম্ভাব্য ভাঙনের ইঙ্গিতও দিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় বৈঠকে বিধায়কদের অনুপস্থিতি, দুই বিধায়কের বহিষ্কার এবং একাধিক সমান্তরাল বৈঠককে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রোববার কালীঘাটের বাসভবনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বৈঠক ডাকলেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২১ জন বিধায়ক। অনুপস্থিতদের উদ্দেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি তাদের ‘মীরজাফর’ বলেও অভিহিত করেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে একই সময় শহরের একটি হোটেলে পৃথকভাবে একাধিক বিধায়কের অংশগ্রহণে ভিন্ন বৈঠকের খবরও সামনে আসে। পরে কিছু বিধায়ক অবশ্য জানিয়ে দেন, তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গ ছাড়তে চান না।
দলীয় সূত্রের দাবি, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের একটি বড় কারণ দুর্নীতি সংক্রান্ত একাধিক মামলা এবং তার রাজনৈতিক প্রভাব। অনেক নেতা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দলের সঙ্গে থাকলে আইনি জটিলতা আরও বাড়তে পারে। এই কারণে একাংশের মধ্যে বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই ‘কালীঘাট বনাম ক্যামাক স্ট্রিট’ এবং ‘নবীন বনাম প্রবীণ’ দ্বন্দ্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একাংশ ‘আমরাই আসল তৃণমূল’ স্লোগান তুলে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলেও জানা গেছে।
বর্তমানে দলের ভেতরে বিধায়কদের উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অতীতের তুলনায় সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়। এতে ভাঙনের শঙ্কা আরও বাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি সরাসরি বড় কোনো দলে যোগদানের দিকে না গিয়েও আলাদা গোষ্ঠী বা ব্লক তৈরির দিকে যেতে পারে, যা মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা টানা হচ্ছে।
এদিকে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ, তদন্তকারীদের তৎপরতা এবং দলীয় বহিষ্কারও সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। অভিযোগের পরপরই দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করে তৃণমূল কংগ্রেস।
পরবর্তীতে দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, কিছু নেতা বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দলের ভেতরে বিভ্রান্তি তৈরি করছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
একসময় কংগ্রেস ভেঙে গঠিত তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘ সময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান ধরে রাখলেও এবার প্রথমবারের মতো এত বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দলটি। শেষ পর্যন্ত এই সংকট কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।