
হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বহরে অতর্কিত হামলা এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের চরম হেনস্তার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দলসমূহ। খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও এবি পার্টি একযোগে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও এই হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের বিচার দাবি করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অভিযোগ তুলে বলা হয়, রাজনীতি দিয়ে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে বিরোধী শিবিরের ওপর নিজস্ব সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়েছে সরকার। হামলায় সম্পৃক্ত বিএনপি নেতাকর্মীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে দলটি।
বুধবার (২৯ জুলাই) এক বিশেষ বিবৃতিতে এসব কথা বলেন ১১ দলীয় ঐক্যের মুখ্য সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ।
বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, গত ২৮ জুলাই এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের গাড়িবহরে সরাসরি হামলা চালানো হয়। এর পরদিন মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জ অভিমুখে যাওয়ার পথে একাধিক স্থানে নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি করা হয়, যা নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের শামিল। তিনি এই অপকর্মে জড়িতদের অতি দ্রুত চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কড়া তাগিদ দেন।
ড. হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের বদৌলতে এ দেশের জনগণ ও রাজপথের রাজনৈতিক দলগুলো বাকস্বাধীনতা ফিরে পেয়েছিল। বাকযুদ্ধের বিপরীতে শারীরিক হামলার কোনো স্থান সুশীল গণতন্ত্রে হতে পারে না। কারো বক্তব্য যদি উসকানিমূলক বা আক্রমণাত্মক মনে হয়, তার জবাব রাজনৈতিক পথেই দেওয়া উচিত। কিন্তু কথার উত্তর সহিসংতায় দেওয়ার অপচর্চা মূলত বিগত ফ্যাসিবাদী মানসিকতারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
বিবৃতিতে তিনি স্পষ্ট জোর দিয়ে বলেন, হবিগঞ্জে বিএনপির যেসব নেতাকর্মীরা অন্যায়ভাবে আইন হাতে তুলে নিয়ে এনসিপি নেতাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, অবিলম্বে সেই সব সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে বিরোধীদলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারির কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে সাধারণের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অতীতের মতো রাজনৈতিক দলদাস না হয়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ‘পরিণতি’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক যুক্তি ও শালীনতার মাধ্যমেই যে কোনো কথার জবাব দিতে হয়। আজ যদি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মতো নেতার কথা সহ্য করা না হয়, তবে আগামীতে সরকারের দুর্নীতি ও ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনগণ নামলে তাদের ওপরও কি দলীয় ক্যাডার লেলিয়ে দেওয়া হবে?
নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী ও মহাসচিব মাওলানা মূসা বিন ইযহার যৌথ বিবৃতিতে জানান, কেবল ভিন্ন মতের কারণে সহিংসতা ও হামলার পথ বেছে নেওয়া কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।
খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের এক যৌথবার্তায় বলেন, এনসিপির ওপর হামলা, সাংবাদ কর্মীদের মারধর, যানবাহন ভাঙচুর ও ব্যক্তিগত মালামাল লুটের ঘটনাটি শুধু একটি দলের ওপর আক্রমণ নয়; বরং এটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সুস্থ পরিবেশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত।
রাজনৈতিক সহাবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, দেশের চলমান রাজনীতিতে সব পক্ষকেই সংযমী ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং যে কোনো উসকানিমূলক বা উগ্র জবাব এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক যৌথ বিবৃতিতে এনসিপির বহরে হামলা ও লুটের ঘটনাকে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও মানুষের স্বাধীন মতামত প্রকাশের ওপর এক নগ্ন হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, এনসিপির ওপর বিএনপি ও ছাত্রদলের উগ্র ক্যাডাররা যে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে, তার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদেরই পুনরুত্থানের অপচেষ্টা করা হচ্ছে—যা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।