
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক সংঘাতে জড়াতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান একটি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা পরিকল্পিতভাবে সাজিয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি।
সংবাদমাধ্যমটির কাছে পরিচয় প্রকাশ না করা এক আঞ্চলিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ দাবি করা হয়েছে। সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অধিকৃত ভূখণ্ডের দিকে যাওয়া একটি আমিরাতি বিমান ছিনতাই এবং পরে সেটিকে সৌদি আরবে অবতরণের ঘটনাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত একটি ‘ভুয়া পতাকা’ অভিযান।
ঘটনার মাত্র তিন দিন আগে কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছিলেন নেতানিয়াহু। ওই সফরের সময়ই কথিত পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হয় বলে দাবি করেছে সূত্রটি। একই সময়ে কয়েকটি আরব দেশের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে বহুপক্ষীয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয় বলে জানানো হয়েছে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গেও যোগসূত্রের দাবি
ওই আঞ্চলিক সূত্রের দাবি, বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাকে ইরানের ওপর চাপানোর লক্ষ্যেই কথিত অভিযানটির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক সংঘাতে জড়ানোর পরিবেশ তৈরি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য বলে দাবি করা হয়।
সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহু আশঙ্কা করছেন—বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেট নির্বাচন হলে তার নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর পদ হারানোর পাশাপাশি তাকে দীর্ঘ সময় ধরে আইনি মামলার মুখোমুখি হতে হতে পারে বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।
ওই সূত্র আরও বলেছে, হোয়াইট হাউস ও ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তাকে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার সংঘাতে ফের যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব ব্যবহারের লক্ষ্যও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইরানি সূত্রটি আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক ও অন্যান্য তৎপরতার ওপর তেহরান ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে। বিমানকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
এ ধরনের কোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের পক্ষ থেকে নেওয়া হলে ইরান তার জবাবে ‘কঠোর ও বিধ্বংসী আঘাত’ হানতে প্রস্তুত বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।
নেতানিয়াহুর আমিরাত সফরের পরই বিমানকাণ্ড
নেতানিয়াহুর সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের কয়েক দিনের মধ্যেই কথিত বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সফরকালে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী।
ঘটনার দিন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাইও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেন। আরবি ভাষায় দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। একই সঙ্গে গাজায় হত্যাযজ্ঞের জন্য দায়ী হিসেবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে অভিহিত করে তাকে আতিথ্য দেওয়ারও সমালোচনা করেন তিনি।
রেজাই আবুধাবিকে আগের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং যুদ্ধ উসকে দেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। পাশাপাশি আবু মুসা, বৃহত্তর তুনব ও ক্ষুদ্র তুনব দ্বীপ নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ‘ভিত্তিহীন দাবি’ বন্ধ করার আহ্বানও জানান তিনি।
বিমানকাণ্ডের আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নেতানিয়াহুর ওই অঞ্চলে অবস্থানের তীব্র বিরোধিতা করে। বিবৃতিতে তাকে ‘শিশুহত্যাকারী ও যুদ্ধবাজ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, পশ্চিম এশিয়ার অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি গুরুতর পরিণতি তৈরি করতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের আগ্রাসন এবং ফিলিস্তিন ও লেবাননে দখলদারত্ব ও সংঘাত বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে এ ধরনের আঞ্চলিক তৎপরতা শান্তি ও সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে।
বিবৃতিতে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।
এর আগেও ইরানি কর্মকর্তারা পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, ইসরাইলের সঙ্গে সহযোগিতা করা কিংবা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দিলে এর গুরুতর পরিণতি হতে পারে।