
ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের শুরু করা আন্দোলন এখন দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষক স্বল্পতা, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, দীর্ঘ ক্লাস সূচি ও পড়াশোনার বাড়তি চাপের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি কয়েকটি এলাকায় সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
প্যারিসের আশপাশে প্রথমে বিক্ষোভ শুরু হলেও পরে তা প্যারিস, মার্সেই, নঁত, স্ট্রাসবার্গ, তুলুজ, লিলসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরোধ, কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা, আবার কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে সংকট মোকাবিলায় বৈঠক করেছেন।
৪ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ
আন্দোলনের কারণে শুক্রবার (২ অক্টোবর) ফ্রান্সজুড়ে চার শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানিয়েছেন, ৪০০-এর কিছু বেশি স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবে শ্রেণি নেওয়া সম্ভব হবে না, সেসব ক্ষেত্রে দূরশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে প্যারিস অঞ্চলের কয়েকটি হাইস্কুলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। তাদের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে একই শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বেশ কিছু স্কুল ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নিয়েও তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ ক্লাস সূচি ও পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ কমানো। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়েও কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
বিক্ষোভ থেকে সংঘর্ষ, ব্যাপক আটক
শুরুতে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। নঁত ও রুয়াঁর দুটি স্কুলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। মার্সেইয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে পেট্রল ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষক আক্রান্ত হন। স্ট্রাসবার্গে একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। তুলুজে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এসব ঘটনার প্রভাব পড়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাতেও; কয়েকটি শহরে সাময়িকভাবে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর ১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। শুধু ১ অক্টোবরেই ১ হাজার ৯৪৯ জনকে আটক করা হয়। ফলে যাচাই করা বর্তমান হিসাব অনুযায়ী আটকের সংখ্যা ‘প্রায় দুই হাজার’ বলা হচ্ছে।
সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১ অক্টোবরের সংঘর্ষে ৩০৫ জন পুলিশ ও জেন্ডারম সদস্য আহত হন। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ১৭০ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা খাতের ৬৫ জন কর্মী আহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক বাড়ছে। সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের (এলএফআই) কয়েকজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। দলটির আইনপ্রণেতা লুই বোয়ার্ড অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। এলএফআই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানালেও পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছে।
সাঁ-দেনির মেয়র ও এলএফআই নেতা বালি বাগায়োকোর ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে উল্লাস করার অভিযোগ ওঠে।
তবে ভিডিওটি নিয়ে প্রকাশিত যাচাইয়ে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম টিএফ১-এর তথ্য যাচাই এবং ল্য পারিজিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওটি খণ্ডিত ছিল। পূর্ণ দৃশ্য বিশ্লেষণে বাগায়োকোকে আগুন লাগাতে দেখা যায়নি; বরং তার পক্ষ থেকে আগুন নেভানোর চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে।
তবে তার অন্য একটি বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর অবরুদ্ধ একটি হাইস্কুলের সামনে পুলিশের আচরণ প্রসঙ্গে তিনি ‘সহিংসতা বৈধ হতে পারে’—এমন মন্তব্য করেন। পরবর্তীতে তিনি সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করেননি। এর পরদিন, ৩০ সেপ্টেম্বর প্যারিসের পুলিশ প্রিফেক্ট তার বিরুদ্ধে ‘অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা’র অভিযোগে বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করেন। এটি একটি বিচারিক অভিযোগ বা রিপোর্ট; বাগায়োকো কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন—এমন তথ্য নেই।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবিগুলো নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা জানিয়েছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর আশপাশে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকট ও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন ফ্রান্সের বড় ধরনের জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছে। একদিকে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুরবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থার অন্যান্য দাবির সমাধানে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে; অন্যদিকে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও ব্যাপক আটকের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। শুক্রবারও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।