
বাংলাদেশে ইন্টারনেট শাটডাউনের পথ চিরতরে বন্ধ করে টেলিযোগাযোগ আইনে বড় ধরনের মৌলিক সংস্কার এনেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০০১ সালের ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন’ সংশোধন করে ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে। নতুন এই অধ্যাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ক্ষমতা আইনি কাঠামো থেকে প্রত্যাহার করে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি আইন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ জারি করে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব তার পোস্টে উল্লেখ করেন, অতীতে এই আইনের অপব্যবহার করে নাগরিকদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, যা ছিল নিবর্তনমূলক। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই সংশোধন কেবল একটি আইনি পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করানোর একটি সাহসী পদক্ষেপ।
সংশোধিত আইনের প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. ইন্টারনেট বন্ধ নিষিদ্ধ:
প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট বন্ধ করার ক্ষমতা আইনি কাঠামো থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে নাগরিকদের অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও ডিজিটাল অর্থনীতির কার্যক্রম আইনি সুরক্ষা পাবে।
২. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংরক্ষণ:
আগে ‘হেইট স্পিচ’ সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। সংশোধনের পর কোনো বক্তব্য কেবল তখনই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে, যখন তা সরাসরি সহিংসতা উসকে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
৩. বিটিআরসি-র ক্ষমতা বৃদ্ধি:
লাইসেন্স প্রদান, ট্যারিফ নির্ধারণ ও মনিটরিংসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা পুনরায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমবে।
৪. বিনিয়োগবান্ধব জরিমানা কাঠামো:
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে জরিমানার পরিমাণ এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।
৫. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ:
মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি-র কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কমিটি (কোয়াসি-জুডিশিয়াল) গঠন করা হয়েছে।
৬. সংসদীয় নজরদারি:
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম বিষয়ে সংসদীয় কমিটির কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়েছে।
৭. আন্তর্জাতিক মানের নজরদারি ব্যবস্থা:
আগের অস্বচ্ছ নজরদারি ব্যবস্থার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ‘ল’ফুল ইন্টারসেপশন’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। নজরদারিকে ‘জরুরি’ ও ‘অ-জরুরি’—এই দুই ভাগে বিভক্ত করে প্রি-অ্যাপ্রুভাল, পোস্ট-ফ্যাক্টো রিভিউ, কেস-বাই-কেস স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর, সময়সীমা নির্ধারণ, ইভেন্ট লগিং ও অ্যাক্সেস কন্ট্রোলের বিধান রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিধিমালা প্রণয়নের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এই সংস্কারকে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।