
লেবাননে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটে শিশুদের স্বাভাবিক জীবন ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। ইউনিসেফের নতুন এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর পাঁচটির মধ্যে একটির বেশি পরিবার জানিয়েছে, তাদের শিশুরা ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাতে ঘুমাতে যায়। একই সঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়ে বাড়ছে শিশুদের মানসিক চাপ। বুধবার ইউনিসেফ এ সতর্কবার্তা দিয়েছে।
ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে লেবাননে প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার শিশু ও তরুণ মানসিক চাপে ভুগেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৩ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের শিশুরা সবসময় উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। অর্ধেকের বেশি পরিবার বলেছে, গত ছয় মাসে তাদের সন্তানদের মানসিক সুস্থতার অবনতি হয়েছে।
লেবাননে ইউনিসেফের প্রতিনিধি মার্কোলুইজি কোর্সি বলেন, লেবাননের শিশু ও তরুণদের এমন এক বোঝা বইতে হচ্ছে, যা কোনো শিশুরই বহন করা উচিত নয়। জরুরি ও টেকসই পদক্ষেপ না নিলে এই চাপ তাদের জীবনকে বহু বছর ধরে প্রভাবিত করবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া ২২ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের শিশুরা ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে গেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে এমন পরিবারের মাত্র ১০ শতাংশ পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে পারছে। আর ৩১ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, অর্থের অভাবে তাদের সন্তান প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারেনি।
অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব শিশু শ্রমেও পড়ছে। ১৪ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের অন্তত একটি শিশু শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এই হার ২০২৫ সালের জানুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। একই সঙ্গে তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
সংঘাতের সরাসরি প্রভাবও ভয়াবহ। গত ২ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২৬১ শিশু নিহত এবং ১ হাজার ৫৬ জন আহত হয়েছে। অর্থাৎ ছয় মাসে প্রতিদিন গড়ে সাত শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। আহত শিশুদের প্রায় ১২ শতাংশ এখন প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বেঁচে আছে।
শিক্ষাব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংঘাতে ৪৩৬টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে, ফলে প্রায় ১ লাখ শিশু শ্রেণিকক্ষের বাইরে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ সময়ে ৮৬ জন শিক্ষক নিহত বা আহত হয়েছেন। জরিপে ৪৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা শিক্ষার পেছনে ব্যয় কমিয়েছে এবং ১৭ শতাংশ পরিবার সন্তানদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। স্কুলে যাওয়া অব্যাহত রাখা শিশুদের ২৯ শতাংশও মানসিক চাপ ও মনোযোগের সমস্যার কারণে স্বাভাবিকভাবে শিখতে পারছে না।
ইউনিসেফ বলছে, শুধু জরুরি মানবিক সহায়তা দিয়ে এ সংকটের ব্যাপকতা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সুরক্ষা ও ভবিষ্যতের সুযোগ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন। কোর্সি সতর্ক করে বলেছেন, জরুরি ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া না হলে একটি পুরো প্রজন্ম এই সংকটের ক্ষত নিয়েই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইউনিসেফের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে লেবাননের শিশুদের ওপর সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের সম্মিলিত প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি বাড়িঘর, স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশও ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে।