
দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করতে জড়ো হওয়া শত শত মানুষকে আটক করেছে পুলিশ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার এ কর্মসূচি পালিত হয়। দিল্লি পুলিশের হিসাবে আটকের সংখ্যা প্রায় ৫৫০ হলেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে ৭০০-এর বেশি বিক্ষোভকারী আটকের কথা বলা হয়েছে।
যন্তর মন্তরে এ বিক্ষোভের ডাক দেয় আম আদমি পার্টি (আপ), অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা), স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই), ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (এনএসইউআই), ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (ডিওয়াইএফআই)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, ছাত্র ও যুব সংগঠন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, এসআইআরকে ঘিরে ভোটার তালিকায় অনিয়ম ও ব্যাপকভাবে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
পুলিশ জানিয়েছে, নিরাপত্তা ও বড় জমায়েতের আশঙ্কায় বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় ব্যারিকেড বসানোর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, বিক্ষোভস্থল ঘিরে চার হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল এবং ড্রোনের মাধ্যমেও নজরদারি চালানো হয়।
আপের দিল্লি সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতিশী, রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় সিংসহ দলটির কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়। এ ছাড়া আইসার সভাপতি নেহা বোরা, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক আইশে ঘোষসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরাও আটক হন।
বিক্ষোভের আগে এক ভিডিও বার্তায় সৌরভ ভরদ্বাজ বলেন, পুলিশ তাদের জানিয়েছে কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়নি। তার দাবি, আপ ছয় দিন আগেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল। যন্তর মন্তর নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল হওয়া সত্ত্বেও সেখানে কর্মসূচির জন্য কেন অনুমতি প্রয়োজন—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ভরদ্বাজ বলেন, নিজেদের উদ্বেগ তুলে ধরার গণতান্ত্রিক অধিকারই তারা প্রয়োগ করছেন। এ সময় কেন্দ্রীয় দিল্লির কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকায় তিনি মানুষকে কাছের খোলা স্টেশনে গিয়ে সম্ভব হলে হেঁটে যন্তর মন্তরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
বিক্ষোভস্থলে যেতে বাধা পেয়ে সঞ্জয় সিং সংসদ চত্বরে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির কাছে অবস্থান নেন। সেখানে তিনি কথিত ‘ভোট চুরি’র প্রতিবাদ করেন এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানান।
আতিশী বলেন, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে তারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছিলেন। যন্তর মন্তরে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় পুলিশ তাদের বাসে তুলে ফতেহপুর বেরি থানায় নিয়ে যায় বলেও দাবি করেন তিনি।
আপের জাতীয় গণমাধ্যমবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত অনুরাগ ধান্ডা বলেন, বিক্ষোভকারীদের আটক করা হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। দেশজুড়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক আইশে ঘোষ জানান, সংগঠনটির কয়েকজন কর্মীসহ ডিওয়াইএফআইয়ের কর্মীদের আটক করা হয়েছে।
এনএসইউআইয়ের জাতীয় সভাপতি বিনোদ ঝাখরসহ সংগঠনটির কয়েকজন নেতাকর্মীও কার্যালয় থেকে যন্তর মন্তরের দিকে পদযাত্রার সময় আটক হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ঝাখর অভিযোগ করেন, তাদের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করা হচ্ছে।
ইন্ডিয়া ইয়ুথ কংগ্রেসও রাইসিনা রোডের কার্যালয় থেকে যন্তর মন্তরের দিকে পদযাত্রা করে। সংগঠনটির সভাপতি উদয় ভানু চিবের নেতৃত্বে হওয়া এ কর্মসূচিতে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে সেখানে যাওয়ার পথে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন কয়েকজন বিক্ষোভকারী।
বিক্ষোভ ঘিরে কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। নিরাপত্তার কারণে দিল্লি মেট্রোর ১২টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার গেটও সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। এর মধ্যে ছিল রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট ও যন্তর মন্তর। পরে এসব স্টেশনের গেট খুলে দেওয়া হয়।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকেলের মধ্যে পুলিশ ৭০০-এর বেশি মানুষকে আটক করার কথা জানিয়েছিল। তবে পরে পুলিশের পক্ষ থেকে আটকের সংখ্যা প্রায় ৫৫০ বলা হয়। সন্ধ্যার দিকে আটক সব বিক্ষোভকারীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। একই সঙ্গে এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ১৬৩ ধারা অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের বিষয়টিও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে দুই নির্বাচন কমিশনার সুষ্মিত সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে ১৪ বার এসআইআর-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছিলেন।