
শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও তহবিলের ঘাটতির প্রতিবাদে ফ্রান্সে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে। শুক্রবার দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এদিন দেশজুড়ে প্রায় ২ হাজার মানুষকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন। এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গত সপ্তাহে প্যারিস অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত দেশের অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার প্যারিসের পাশাপাশি মঁপেলিয়ে, নঁত, মার্সেই, রেন, স্ট্রাসবুর্গ, ব্রেস্টসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘ ক্লাসের সময়, শিক্ষক স্বল্পতা, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং অপর্যাপ্ত ও অস্বস্তিকর শ্রেণিকক্ষের কারণে তাদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, পরিস্থিতি এখন বিক্ষোভের গণ্ডি ছাড়িয়ে নগর সহিংসতার দিকে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। রয়টার্স জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত দেশজুড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে নুনেজ দাবি করেছেন; তাদের বেশির ভাগই কিশোর।
বিচারমন্ত্রী জেরার্ড দারমানিন বলেন, আন্দোলন এখন আর শুধু উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন স্থানে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার প্রায় ২ হাজার মানুষকে হেফাজতে নেওয়া হয়, যাদের প্রায় ৯০ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানান, শুক্রবার দেশের প্রায় ৩ হাজার ৭০০ বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৩৫টি কোনো না কোনোভাবে বিক্ষোভে ক্ষতিগ্রস্ত বা কার্যক্রমে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আন্দোলন শুরুর পর থেকে অন্তত ৬৫ জন শিক্ষা কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪০ জন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। একই সময়ে ১৭০ শিক্ষার্থী আহত হওয়ার তথ্যও জানিয়েছেন তিনি।
বিক্ষোভে কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পাশাপাশি অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। প্যারিসে দুটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথে আগুন দেওয়া হয়। ব্রেস্টে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। মার্সেইয়ে পুলিশের দিকে আতশবাজি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। রেন ও পান্তিনে আবর্জনার পাত্রে আগুন দেওয়া হয়।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বেলফোর্ট শহরে বিক্ষোভের সময় এক পুলিশ সদস্যকে একদল তরুণ ধাওয়া করে মাটিতে ফেলে মারধর করার ঘটনা ঘটে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ ঘটনাটিকে অত্যন্ত সহিংস বলে বর্ণনা করেছেন। এ ঘটনায় ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে হত্যাচেষ্টার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বিবিসির যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একদল তরুণ ওই পুলিশ সদস্যকে ঘিরে ধাওয়া করছে। তিনি মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর কয়েকজন তাকে ঘুষি ও লাথি মারেন।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। ১৬ বছর বয়সী লোলা এএফপিকে বলেন, শুক্রবার সকালে তাদের স্কুল বন্ধ ছিল। পুলিশের হামলা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে বলেও দাবি করে সে।
শিক্ষামন্ত্রী জেফ্রে বলেন, শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও আন্দোলনে যুক্ত হয়ে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। সরকার অবশ্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেছে এবং অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বদলি করার লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
এদিকে শিক্ষক ইউনিয়ন ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আগামী মঙ্গলবার নতুন বিক্ষোভের পাশাপাশি শিক্ষকদের ধর্মঘটের ডাকও দেওয়া হয়েছে।