
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক মোতায়েনে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের জীবনযাপন নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। ২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে জাহাজটিতে অবস্থান করছেন হাজারো মার্কিন সামরিক সদস্য। এর মধ্যে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসামগ্রীর ঘাটতি, পানি নিষ্কাশন ও প্লাম্বিংয়ের সমস্যা, ডাক সরবরাহে বিঘ্ন এবং মানসিক চাপের মতো নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতারা পেন্টাগনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জাহাজটির পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোকে ‘ভুলভাবে উপস্থাপিত’ বলে মন্তব্য করেছেন।
মার্কিন সামরিকবিষয়ক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের কয়েকজন নাবিক এমনকি জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। পরিবারের সদস্যরাও দীর্ঘদিন মোতায়েনে থাকা স্বজনদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে এক নাবিক সাগরে পড়ে যান। পরে হেলিকপ্টারে তাকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। কীভাবে ওই নাবিক পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন, তা এখনো তদন্তাধীন।
এ পরিস্থিতিতে কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে পাঠানো চিঠিতে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের এই রণতরীতে ‘মৌলিক সরবরাহের সংকট, দূষিত পানি, প্লাম্বিং ত্রুটি, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ডাক ব্যবস্থার ব্যাঘাত’-এর অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি এসব বিষয় জরুরি ভিত্তিতে পর্যালোচনার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে এত দীর্ঘ সময় ধরে নৌবাহিনী এই মাত্রার অপারেশনাল চাপ টেকসইভাবে সামলাতে পারছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর রুবেন গ্যালেগোও জাহাজটির কথিত ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ তদন্তে কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদলকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান মাইকেল লেভিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, জাহাজটিতে ছত্রাকধরা গোসলখানা, অচল টয়লেট, কয়েক সপ্তাহ ধরে কাপড় ধোয়ার সুযোগ না থাকা, দীর্ঘ সময় গরম পানি না থাকা এবং স্বাস্থ্যসামগ্রীর ঘাটতির মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে।
জাহাজে থাকা এক নাবিকের এক স্বজন বিবিসিকে জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের পর তার স্বজনের ওজন ৬৫ পাউন্ড বা প্রায় ২৯ কেজি কমে গেছে। দীর্ঘদিন বন্দরে না ভেড়া, জাহাজ থেকে নামতে না পারা, সার্বক্ষণিক কম্পন ও শব্দ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং তাজা খাবারের সংকট নাবিকদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে তুলছে বলে দাবি করেন তিনি।
ওই স্বজন জানান, তার আত্মীয় তাকে লিখেছেন, ‘আমি মৃতপ্রায় ক্লান্ত। একেবারে মৃত।’
তবে মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা এসব অভিযোগের বড় অংশ অস্বীকার করেছেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, নাবিকদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যাচেষ্টার ঘটনা বেড়েছে—এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
তার ভাষ্য, যুদ্ধকালীন তৎপরতার কারণে নিয়মিত সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলেও বর্তমানে অগ্রাধিকার অনুযায়ী প্রথমে খাদ্য, এরপর স্বাস্থ্যসামগ্রী এবং পরে ডাক সরবরাহ করা হচ্ছে। একই কর্মকর্তা জানান, জাহাজে বিশুদ্ধ পানি, কার্যকর শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পুষ্টিকর খাবারের ধারাবাহিক সরবরাহ রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার পানামায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, সরকার চেষ্টা করে যেন ‘প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি ক্রু ও প্রতিটি ক্যাপ্টেন’ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা পান। কিছু সামরিক মোতায়েন অন্যগুলোর তুলনায় দীর্ঘ হতে পারে উল্লেখ করে তিনি নাবিকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতাও জানান।
ট্রাম্প প্রশাসনের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী—দুজনই মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত বছরের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল। পরে ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার আগে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী মে মাসে জাহাজটির যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার কথা থাকলেও কয়েক দফায় সেই সময়সীমা বাড়ানো হয়। এরপর এর ফেরার জন্য আর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি।
তবে গত বৃহস্পতিবার একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।
দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের সময় নৌসদস্যদের মানসিক চাপ কমাতে অতীতেও বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল বলে সামরিক প্রকাশনা স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস জানিয়েছে। এর মধ্যে বিঙ্গো, আর্ট সেশন ও সংগীত প্রতিযোগিতার মতো আয়োজন ছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে কর্মরত সদস্যদের মধ্যে ‘তীব্র মানসিক সংকট’-এর হার বেশি। অনুপযুক্ত আবাসন, ক্রমাগত শব্দ এবং পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অভাবকে সেখানে মানসিক চাপের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সামরিক তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক প্রকাশনা ইউএসএনআই নিউজের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনী ও মেরিন কোরে মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ এখনো আত্মহত্যা।