
ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা দেশটির সঙ্গে ওয়াশিংটনের নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বুধবার (০৭ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানান, ভেনেজুয়েলায় উৎপাদিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ভূমিকা নেবে এবং এই ব্যবস্থা অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর থাকবে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ামির কাছে গোল্ডম্যান স্যাকস আয়োজিত একটি জ্বালানি সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলা থেকে যে তেল উৎপাদিত হবে, তা আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করব।’
রাইটের এই মন্তব্য আসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের পরদিন। এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ‘ভেনেজুয়েলা শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল হস্তান্তর করবে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আরেক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলা ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাবে, যা দেশটির দৈনিক উৎপাদনের প্রায় এক থেকে দুই মাসের সমান। তিনি আরও বলেন, ওই তেল বিক্রির মুনাফা তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করবেন।
জ্বালানিমন্ত্রী রাইট বলেন, ‘ভেনেজুয়েলায় যেসব পরিবর্তন একেবারেই প্রয়োজন, তা বাস্তবায়নে এই তেল বিক্রির ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব থাকা জরুরি।’ তিনি যোগ করেন, এই অর্থ আবার ভেনেজুয়েলায় ফিরে যেতে পারে এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের উপকারে আসতে পারে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে, ২০১৯ সালের পর থেকে ভেনেজুয়েলা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। ওই বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশটির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যার ফলে তেল উৎপাদন ও রপ্তানি কঠোরভাবে সীমিত হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আংশিক অবরোধও কার্যকর করেছে।
এর প্রভাবে বহু তেলবাহী ট্যাংকার ভেনেজুয়েলার বন্দর ছাড়তে পারছে না। এতে সরকারের প্রধান রাজস্ব উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অতিরিক্ত তেল স্থলভাগের ট্যাংক ও উপকূলের কাছে ভাসমান জাহাজে মজুত রাখতে হচ্ছে। তবে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি তদারকিতে যুক্তরাষ্ট্র কোন আইনি কাঠামোর আওতায় কাজ করবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির তেল বিক্রির নিয়ন্ত্রণ পাবে। যদিও বুধবার সকাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে দেশটির নেতৃত্ব এই পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তির বিষয় নিশ্চিত করেনি।
রাইট জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে এবং সেখানে আগে কার্যক্রম পরিচালনা করা যুক্তরাষ্ট্রের বড় তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও আলোচনা হচ্ছে। পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পশ্চিমা বিশ্বের কয়েকটি বড় তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা শুক্রবার বিকেলে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
গত দুই দশকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বহু পশ্চিমা তেল কোম্পানি ভেনেজুয়েলা থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। দেশটির বিপুল তেল মজুত বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা তৈরি করলেও ঝুঁকির মাত্রা বেশি থাকায় সেখানে ফেরার সিদ্ধান্ত সহজ নয়। বর্তমানে শেভরনই একমাত্র বড় মার্কিন তেল কোম্পানি, যারা ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
রাইটের বক্তব্যের পর বুধবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে যায়। তিনি বলেন, বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী ভেনেজুয়েলা তুলনামূলক দ্রুত দৈনিক কয়েক লাখ ব্যারেল উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম। তবে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি উৎপাদনে যেতে হলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এবং দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে।