
প্রাথমিক শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি-দাওয়া, শিক্ষক সংকট এবং পেশাগত কাঠামোর নানা অসঙ্গতি দূর করতে নতুন শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত নীতিমালায় শিক্ষক নিয়োগ থেকে পদোন্নতি, বদলি, প্রশিক্ষণ, কর্মমূল্যায়ন এবং বেতন-ভাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে একটি সুসংহত কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষক সমাজের বহুল আলোচিত ১১তম গ্রেডের দাবিও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষক পেশাকে আরও আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ করতে যুগোপযোগী শিক্ষক নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন নীতিমালায় শিক্ষকতার পেশাজীবনের প্রায় প্রতিটি ধাপের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলি, কর্মমূল্যায়ন, পদোন্নতি এবং বেতন-ভাতার বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নানা জটিলতা ও অস্পষ্টতা দূর করে একটি সুসংহত পেশাগত কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার কাঠামো প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করেই নীতিমালার মূল রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। শিক্ষকরা যাতে তাদের চাকরিজীবনের অগ্রগতির বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পান, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
নীতিমালার আলোচনায় প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধার বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ১১তম গ্রেডে উন্নীতকরণের দাবি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পর্যালোচনায় রয়েছে। নীতিমালা বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে বাজেটে প্রয়োজনীয় সংস্থান রাখার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।
এদিকে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ, চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা কম থাকায় পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের ৩২ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। পদোন্নতি-সংক্রান্ত একটি মামলা দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকায় সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রম আটকে আছে। ফলে হাজার হাজার বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অস্থায়ীভাবে কাজে লাগানোর বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার। নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এটিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে নয়, বরং অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে শিক্ষকদের জন্য একটি যুগোপযোগী নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।’
তিনি বলেন, ‘নতুন নীতিমালার মূল লক্ষ্য তিনটি, শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং একটি সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার কাঠামো তৈরি করা। নীতিমালায় শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলি, মূল্যায়ন, পদোন্নতি ও বেতন-ভাতাসহ পেশাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, ‘দীর্ঘদিনের দাবি ১১তম গ্রেডসহ শিক্ষকদের বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার বিষয়ও নীতিমালা প্রণয়নের আলোচনায় রয়েছে। নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হলে তা মেটাতে বাজেটে প্রয়োজনীয় সুযোগ রাখার চেষ্টা করছে সরকার।’
শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অস্থায়ীভাবে কাজে লাগানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে। তবে, এটি হবে স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা। দীর্ঘমেয়াদে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমেই শিক্ষক সংকটের স্থায়ী সমাধান করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি সংযোজন নয়, বরং এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন, নাগরিক চেতনা ও জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকবে।’