
ধসে পড়ার শঙ্কা ঠেকানোই ছিল ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জ। বছরজুড়ে সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল নড়বড়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা। সেই লক্ষ্য আংশিকভাবে অর্জিত হলেও এর মূল্য দিতে হয়েছে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ধাক্কার মাধ্যমে।
কিছু সামষ্টিক সূচকে স্থিতির ইঙ্গিত মিললেও অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের সংকট গভীর হয়েছে, দ্রুত বেড়েছে খেলাপি ঋণ। পাশাপাশি বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সংকোচন এবং রফতানি আয়ের চাপ পুরো অর্থনীতিকে দুর্বল অবস্থায় রেখেছে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেয়নি। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ সুদহার, কঠোর মুদ্রানীতি ও ব্যয়সংকোচনের মাধ্যমে যে স্থিতিশীলতা এসেছে, তা শিল্প ও ব্যবসার গতি কমিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত স্বস্তি আনতে পারেনি।
বিনিয়োগে খরা, বড় দুর্বলতা
২০২৫ সালে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে এসেছে বিনিয়োগের স্থবিরতা। অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে আসে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে। উচ্চ সুদহার, ব্যবসায় ব্যয় বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারান। অনেকেই নতুন প্রকল্পে যাওয়ার বদলে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকেই অগ্রাধিকার দেন।
এই বিনিয়োগ মন্দার প্রভাব পড়েছে বিদেশি বিনিয়োগেও। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ১ শতাংশের নিচেই আটকে থাকায় অর্থনীতির বৈচিত্র্য বাড়েনি, তৈরি হয়নি মানসম্মত নতুন কর্মসংস্থানও।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, বর্তমানে ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন প্রকল্প নেওয়ার মতো পরিবেশ নেই। ব্যাংক ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, আর উচ্চ সুদ, ভ্যাট ও করের চাপ নতুন উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করছে। এর প্রভাব পড়ছে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিতেও।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার যে অর্থনৈতিক সংকট উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, তার বড় অংশ এখনো কাটেনি। প্রবৃদ্ধি মন্থর, বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান সংকুচিত এবং রফতানিতে ভাটা— এই চিত্রে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তবে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তির কথা উল্লেখ করেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার, তা বেড়ে এখন ২৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং অর্থপাচার কমে যাওয়ায় ডলারের জোগান বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
ব্যাংক গ্রাহকদের উৎকণ্ঠার বছর
২০২৫ সাল ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য ছিল উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার সময়। বছরের শুরু থেকেই কয়েকটি ব্যাংকে নগদ অর্থের তীব্র সংকট দেখা দেয়। অনেক গ্রাহক জরুরি প্রয়োজনেও টাকা তুলতে পারেননি। বিশেষ করে ইসলামি ধারার পাঁচটি ব্যাংকের গ্রাহকরা বছরের শেষ পর্যন্ত সঞ্চয় ফেরত পাননি।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশ্বাস দিলেও বাস্তবে সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়নি। একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরুর পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে কার্যত অর্থ উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়।
খেলাপি ঋণের দ্রুত বৃদ্ধিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। সেপ্টেম্বর ২০২৫ শেষে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। ২০২৪ সালের একই সময়ে এই হার ছিল ১৬.৯৩ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধা কমে যাওয়ায় প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র সামনে এসেছে।
মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে স্বস্তি, বাজারে চাপ
২০২৫ সালের শুরুতে খাদ্যমূল্যস্ফীতি প্রায় ১১ শতাংশে থাকায় নিত্যপণ্যের বাজারে অস্বস্তি ছিল তীব্র। সরকারি পরিসংখ্যানে পরে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত মিললেও বাস্তব বাজারে তার প্রতিফলন খুব সীমিত ছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নেমে আসে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশে এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। তবে চাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের দামে তেমন স্বস্তি আসেনি।
টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে মোটা চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা, ভোজ্যতেলের দাম লিটারে প্রায় ২০ টাকার বেশি। সবজির বাজারেও অস্থিরতা ছিল, কোনো কোনো সময়ে বেগুনের দাম কেজিতে ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি কমলেও মজুরি প্রায় স্থবির থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এতে বাংলাদেশ ‘নিম্নমাত্রার অর্থনৈতিক সমতায়’ আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কর্মসংস্থানে সংকট আরও গভীর
২০২৫ সাল শেষ হয়েছে চাকরির বাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সুখবর ছাড়াই। সরকারি এক অভ্যন্তরীণ জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত এক বছরে অন্তত ২৪৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় এক লাখ শ্রমিক।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, বড় বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিও সীমিত থাকছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে মোট কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার, যার মধ্যে ১৬ লাখ ৪০ হাজারই নারী— অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্তদের প্রায় ৯৪ শতাংশ নারী শ্রমশক্তি।
রফতানিতে ধাক্কা ও গতি হারানো শিল্প
২০২৫ সালে রফতানি খাতেও একের পর এক নেতিবাচক ধাক্কা আসে। যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাজারে শুল্ক হুমকি, অর্ডার স্থগিত, শ্রম অসন্তোষ, কাস্টমস কার্যক্রম বন্ধ এবং বিমানবন্দরের কার্গো অগ্নিকাণ্ড রফতানিতে বড় চাপ সৃষ্টি করে।
জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে রফতানি আয় দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শুল্ক ঝুঁকি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমেছে।
শেয়ারবাজার ও ব্যাংক ঋণে চাপ
২০২৫ সালে শেয়ারবাজারও ছিল চাপের মধ্যে। ডিএসইএক্স সূচক বছরজুড়ে প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। ব্যাংক একীভূতকরণ ও লিকুইডেশন প্রক্রিয়া বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে আরও দুর্বল করেছে।
এদিকে, নভেম্বরের শেষ থেকে সরকারের ব্যাংক ঋণ হঠাৎ বেড়ে যায়। ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়ায় ৪৫ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। ব্যবসায়ী নেতারা আশঙ্কা করছেন, এতে তারল্য সংকট ও সুদের চাপ আরও বাড়তে পারে।
আইএমএফ কর্মসূচি ও রিজার্ভে স্বস্তি
আইএমএফ কর্মসূচি বহাল রাখতে সরকারের কঠোর সিদ্ধান্তের ফলে জুনে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা আসে। এতে রিজার্ভ ও ডলার বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফেরে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বৈদেশিক লেনদেনে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত হয়েছে। একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি।
সব মিলিয়ে, ২০২৫ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ছিল স্থিতিশীলতা ধরে রাখার কঠিন এক বছর। ধস ঠেকানো গেলেও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রফতানিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরেনি— এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।