
নতুন বছরের প্রথম দিনে স্বাভাবিক ব্যাংকিং লেনদেন শুরু হয়েছে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য। এখন তারা তাদের জমা রাখা অর্থ উত্তোলন এবং নতুন লেনদেন করতে পারছেন।
ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বিভিন্ন শাখায় বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) এ তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। অনেক শাখায় পুরোনো ব্যানার সরিয়ে নতুনভাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সাইনবোর্ড বসানো হয়েছে। এই পাঁচটি ব্যাংক হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আজ থেকে গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবে টাকা জমা দিতে এবং আমানত বিমার আওতায় সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত টাকা তুলতে পারছেন।
দীর্ঘদিন পর অর্থ উত্তোলন করতে পেরে গ্রাহকরা স্বস্তি প্রকাশ করছেন। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় টাকা তুলতে আসা গ্রাহক আসিফ রহমান বলেন, “দীর্ঘ অপেক্ষার পর টাকা তুলতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এই টাকাটি আমার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।”
বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি নির্ধারিত স্কিম চূড়ান্ত করেছে। সাধারণ গ্রাহকের যাদের আমানত দুই লাখ টাকা পর্যন্ত, তাদের টাকা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত এবং একবারে পুরো টাকা তোলা যাবে ‘আমানত সুরক্ষা আইন’-এর আওতায়। যাদের আমানত দুই লাখ টাকার বেশি, তারা প্রতি তিন মাস অন্তর সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা করে দুই বছর পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবেন।
তবে ৬০ বছরের বেশি বয়সী বা ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সময়সীমা অতিক্রম করেও তাদের অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।
এর আগে, একীভূত প্রক্রিয়ায় এই পাঁচ ব্যাংকের সব চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ এবং আগের সব চুক্তি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে জানিয়েছে, গ্রাহকদের টাকা পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে। যারা এখন টাকা তুলবেন না, তারা বাজারভিত্তিক মুনাফা পাবেন এবং প্রয়োজনে আমানতের বিপরীতে ঋণ নিতে পারবেন।
নতুন ব্যাংকের অধীনে সব চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় চলে গেছে। স্থায়ী আমানত নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে তোলা যাবে না। তবে বর্তমান জমার বিপরীতে গ্রাহক সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা নিতে পারবেন। নতুন জমার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ নেওয়া যাবে।
যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা নেই, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ব্যাংকের কর্মী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন। নতুন পরিচালনা পর্ষদ চাকরির শর্তাবলি প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে পারবে, তবে কেউ লিখিতভাবে চাকরি না করার ইচ্ছা জানালে ইস্তফা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, হস্তান্তরের সময় আগের ব্যাংকের নামের চেকবই, ডিপোজিট স্লিপ, রসিদ, ভাউচার, আবেদনপত্রসহ সব ব্যাংকিং দলিল নতুন ব্যাংকের পক্ষ থেকে বৈধ হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ গ্রাহকদের নতুন কোনো কাগজপত্র নেওয়ার প্রয়োজন নেই; পুরোনো কাগজপত্র দিয়েই স্বাভাবিক লেনদেন চালানো যাবে।
নতুন ব্যাংকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন জোরদার করা হবে যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে এই সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর ফলে আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং পুরো আর্থিক খাত আরও স্থিতিশীল হবে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির স্থায়ী আমানত এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধনে রূপান্তর করা হবে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, প্রভিডেন্ট ফান্ড, যৌথ উদ্যোগ, বহুজাতিক কোম্পানি ও বিদেশি দূতাবাস এ বিধানের আওতায় পড়বে না।
আগের সরকারের সময় কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েকটি ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ নিয়েছিল। এই অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের চাপেই কয়েকটি ইসলামী ব্যাংক গভীর সংকটে পড়ে। এক বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক তদারকি এবং তারল্য সহায়তা দিলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।
অবশেষে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী ৫ নভেম্বর এই ব্যাংকগুলিতে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। পরে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। বর্তমানে এই পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহক রয়েছে, যাদের আমানত ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে।
দেশজুড়ে এই ব্যাংকের ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ রয়েছে। একীভূতকরণের পর একই এলাকার একাধিক শাখা এক বা দুই শাখায় সীমিত করা হবে। পরিচালন খরচ কমাতে কর্মীদের বেতন-ভাতা ইতিমধ্যেই ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে।