
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শোক ও বিতর্কের আবহে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে আখ্যা দিয়েছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ প্রার্থনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। এর আগে খালেদা জিয়ার আত্মার শান্তি কামনায় সেখানে মহাযজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে পুরোহিত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইসকনের শ্যামানন্দ প্রভুদাস।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া, তিনি হাঁটতে হাঁটতে জেলখানার ভেতরে গেলেন; ফিরে আসলেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে, একেবারে অর্ধমৃত। তার মানে জেলখানার ভেতরে তার ওষুধ, তার খাবারে নানাভাবে কারসাজি করা হয়েছে। তিনি যাতে তিলে তিলে ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, সেই ব্যবস্থাটাই সেদিন করা হয়েছিল; তৎকালীন সরকারে যারা ছিলেন, তারা সেই কাজটি করেছে। এই কারণে আমি বলি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। চক্রান্ত করে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়া ছিলেন গোটা জাতির জন্য আশ্রয় ও প্রেরণার প্রতীক। দমন-পীড়নের কঠিন সময়েও তার উপস্থিতি বিএনপির নেতাকর্মীদের সাহস জুগিয়েছে। তিনি দেশ ছেড়ে যাননি, হুমকির মুখেও জনগণের পাশে থেকেছেন। এই কারণেই তিনি প্রকৃত অর্থে ‘জাতির মা’ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
রিজভী বলেন, “একটি পরিবারে মা বেঁচে থাকলে সন্তানরা শক্তি পায়। ঠিক তেমনই খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের মানুষের আশ্রয়, ভরসাস্থল। আজ আমরা সেই আশ্রয় সাময়িকভাবে হারালাম।”
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক চরিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি ছিলেন একদিকে ধর্মপ্রাণ, অন্যদিকে গভীরভাবে অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক ও মানবিক নেতা। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের জন্য তার দরজা ছিল খোলা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আক্রমণের জবাবেও তিনি শালীনতা বজায় রেখেছেন এবং কখনো কটু ভাষা ব্যবহার করেননি।
রিজভী আরও বলেন, “রাজনীতি মানে শুধু উচ্চস্বরে কথা বলা নয়, বরং জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করা— এই দৃষ্টান্ত খালেদা জিয়া রেখে গেছেন।” তিনি যোগ করেন, শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। তিনি খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে দেশ ও জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, “ক্ষমতায় গেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সবাইকে নিয়ে ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আমাদের প্রত্যাশা, বিএনপি আগামীতে সবাইকে নিয়েই পথ চলবে।”
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি ও বিএনপির প্রান্তিক জনশক্তি উন্নয়ন বিষয়ক সহ-সম্পাদক অপর্ণা রায় দাস বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আমরা আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবককে হারালাম। এই শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।” তিনি জিয়া পরিবারের পাশে থেকে কাজ করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক সমীর কুমার বসুর সঞ্চালনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় নেতা দেবাশীষ রায় মধু, মাহাবুবুল ইসলাম, জাপান বিএনপির উপদেষ্টা কাজী এনামুল, স্বেচ্ছাসেবক দলের ডা. জাহেদুল কবির জাহিদ, ছাত্রদলের ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সুরঞ্জন ঘোষ, গৌতম মিত্র, সুভাষ দাস, জয়দেব রায়, বিশ্বজিৎ ভদ্র, সীমান্ত দাসসহ অনেকে।