
রাজধানীর কাফরুলে মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করার জেরে চলন্ত মোটরসাইকেল আরোহী রাফির মাথায় নির্মমভাবে ইট ছুঁড়ে মারার ঘটনায় দুই অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা গা শিউরে ওঠা সেই হামলার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দ্রুততম সময়ে প্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন করল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এই ঘটনায় জড়িত বাকি দুই আসামিকে ধরতেও সাঁড়াশি অভিযান চলছে।
আজ শুক্রবার (১২ জুন) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য জানান ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— মো. পারভেজ (৩০) ও আনোয়ার হোসেন বাবু (৩২)। এই মামলার অন্য দুই আসামি মো. ফয়সাল ওরফে কালু এবং আমিন বর্তমানে পলাতক রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে ডিসি মোস্তাক সরকার জানান, গত মঙ্গলবার (১০ জুন) রাত আনুমানিক ১টা ২০ মিনিটে কাফরুল থানার পূর্ব শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডের প্রায় ১০০ গজ পূর্ব দিকে ইব্রাহিমপুর পাকা রাস্তায় এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। রাফি যখন মোটরসাইকেল চালিয়ে নিজের বাসায় ফিরছিলেন, তখন পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা তার ওপর চড়াও হয়। ঘাতকেরা অত্যন্ত নিখুঁত নিশানা করে তার মাথার ডান পাশে ভারী ইট ছুঁড়ে মারলে তিনি গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় পিচঢালা সড়কে ছিটকে পড়েন।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার পরপরই নিজেদের অপরাধ ঢাকতে হামলাকারীরা আহত রাফিকে একটি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত সরিয়ে দেয়। তবে নিকটবর্তী একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় পুরো নৃশংসতার চিত্রটি বন্দি হয়ে যায়। পরবর্তীতে ভিডিওটি ইন্টারনেটে ভাইরাল হলে দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও আলোড়ন তৈরি হয়।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী রাফির চাচা নুর হোসেন বাদী হয়ে কাফরুল থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। এরপরই সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে চার হামলাকারীকে নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে পুলিশ।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ময়মনসিংহের ধোবাউড়া থানার ভারতীয় সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা থেকে মূল হোতা পারভেজকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। একই সাথে রাজধানীর ইব্রাহিমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় আনোয়ার হোসেন বাবুকে। এছাড়া ঘটনাস্থলের অদূরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা রাফির মোটরসাইকেলটিও উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
হামলার নেপথ্যের কারণ নিশ্চিত করে পুলিশ জানায়, প্রধান অভিযুক্ত পারভেজ একসময় ভুক্তভোগী রাফিদের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন। সেই সুবাদে তাদের পূর্বপরিচয় ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে পারভেজ ও তার সহযোগীরা ওই এলাকায় মাদক কারবার শুরু করলে তাতে তীব্র বাধা প্রদান করেন রাফি।
এই মাদক ব্যবসার বিরোধিতা করাকে কেন্দ্র করেই মূলত দুই পক্ষের মধ্যে চরম শত্রুতা তৈরি হয়। ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যায়ও তাদের মধ্যে এই নিয়ে তীব্র কথাকাটাকাটি ও একে অপরকে দেখে নেওয়ার হুমকির ঘটনা ঘটেছিল বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
সেই ক্ষোভ থেকে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার রাতে ১টার দিকে পারভেজ, কালু, বাবু ও আমিন পূর্ব শেওড়াপাড়া এলাকায় পাহারায় বসেন। রাফি মোটরসাইকেল নিয়ে ঐ সড়ক পার হওয়ার সময় আমিন তার পথ আটকানোর চেষ্টা করে এবং চলন্ত অবস্থাতেই পারভেজ তার মাথা লক্ষ্য করে সজোরে ইট ছুঁড়ে মারে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিসি মোস্তাক সরকার আরও বলেন, "ঘটনার পর আসামিরা ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে এবং স্থানীয়দের কাছে দাবি করে যে উপর থেকে ইট পড়ে রাফি আহত হয়েছেন। পরে তারা আহত অবস্থায় তাকে অন্যত্র ফেলে পালিয়ে যায়।"
পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত পারভেজ এবং পলাতক কালুর বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় একাধিক মাদক সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। ধৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে এবং বাকিদের ধরতে ডিএমপির অভিযান অব্যাহত রয়েছে।