
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় পরিদৃষ্ট হচ্ছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার অত্যন্ত গোপনীয় আলোচনা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক এক সিদ্ধান্তে চরম বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দুই মিত্র দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যকার এই মতবিরোধ এখন আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই চুক্তি সংক্রান্ত সংলাপের বিষয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রকৃত তথ্য ও ভেতরের খবর জানতে নেতানিয়াহু এখন হন্যে হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
চলমান সংঘাতের শুরুর দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চললেও, বর্তমানে রণকৌশল ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে আমেরিকা ও ইসরাইলের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাই তিনি দ্রুততম সময়ে যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া। অন্যদিকে, চলতি বছরেই নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাওয়া নেতানিয়াহু যুদ্ধের শুরুতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করে পিছু হটতে সম্পূর্ণ নারাজ।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি বড় ঘোষণা দেন। তিনি জানান, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনার পর একটি খসড়া চুক্তি অনুমোদন পেয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করেই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাতিলের নির্দেশ জারি করেছেন। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তির মূল বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এই দাবিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে তেল আবিব। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পরপরই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি কড়া বিবৃতি জারি করা হয়। বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয় যে— ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ বা অংশীদার ইসরাইল নয়। তবে নেতানিয়াহু আশা প্রকাশ করেছেন যে, চূড়ান্ত চুক্তিতে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের আর্থিক ও সামরিক সমর্থন বন্ধের মতো কঠোর শর্তগুলো অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই দুই নেতার সম্পর্ক বেশ মজবুত বলেই মনে হচ্ছিল। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে তারা একযোগে অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প যেখানে ভেনিজুয়েলার মতো একটি দ্রুত ও চমকপ্রদ রাজনৈতিক বিজয় চাইছিলেন, সেখানে নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ছিল দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিনিময়ে হলেও ইরান ও হিজবুল্লাহর মতো শক্তিকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ অবরুদ্ধ হওয়া এবং বিশ্বজুড়ে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের নিজস্ব জনপ্রিয়তা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সংকটে পড়ে।
অপরদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার পর দুই বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি হিজবুল্লাহর রকেট হামলা বন্ধ করতে না পারায় ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তীব্র গণক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৭ শতাংশ ইসরাইলি নাগরিক বর্তমান যুদ্ধের ফলাফলে সন্তুষ্ট, আর বাকি বিপুলসংখ্যক জনগণ এখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ফলে নিজেদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় দুই দেশের নেতাই এখন কার্যত একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। গত সপ্তাহে ট্রাম্পের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই নেতানিয়াহু ইরানে বিমান হামলার নির্দেশ দিলে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উভয় পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধ থামানোর অনুরোধ করতে বাধ্য হন। এমনকি লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান বৃদ্ধির পর এক উত্তপ্ত ফোনালাপে ট্রাম্প চরম ক্ষুব্ধ হয়ে নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় গালমন্দ করেন। ওই সময় ট্রাম্প কড়া ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থনের কারণেই নেতানিয়াহু এখনও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ঘরোয়া রাজনীতিতে দুর্নীতি মামলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়ে ট্রাম্প সবসময় নেতানিয়াহুর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে ট্রাম্পের বর্তমান যুদ্ধবিরোধী ও যুদ্ধ থামানোর এই অনমনীয় অবস্থান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে ঘরের মাঠে এক চরম উভয়সংকটে ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াইয়ে ফেলে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি