
দেশজুড়ে চলমান দাবদাহের দাপট দিন দিন আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪৮টি জেলায় মৃদু থেকে তীব্র মাত্রার তাপপ্রবাহ সক্রিয় রয়েছে। এই চরম আবহাওয়ার মধ্যেই বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের নতুন এক হুঁশিয়ারি বিজ্ঞানমনস্ক ও সাধারণ মানুষকে শঙ্কিত করে তুলেছে— ‘সুপার এল নিনো’র দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এখন বিশ্ব। গবেষকরা জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে বৈশ্বিকভাবে এই এল নিনোর তাণ্ডব চালানোর আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপার এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে দাবদাহের স্থায়িত্ব এবং এর তীব্রতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অতীতে যেখানে বছরে বড়জোর একবার বা দুবার চার-পাঁচ দিন মেয়াদী তাপপ্রবাহ দেখা যেত, সেখানে বর্তমান সময়ে বছরে চার থেকে পাঁচটি কিংবা তার চেয়েও বেশি সংখ্যক দাবদাহের মুখোমুখি হতে হচ্ছে জনগণকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে গত কয়েক বছর ধরেই রেকর্ড ভাঙা চরম তাপমাত্রা ও উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এই এল নিনো যদি পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও চরম আকার ধারণ করবে। সুপার এল নিনোর মরণকামড়ে বিশ্বের বহু দেশ যেমন তীব্র খরা ও দাবদাহে পুড়বে, তেমনই অনেক অঞ্চলে দেখা দেবে অস্বাভাবিক ও অতিবৃষ্টির তাণ্ডব।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন যে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এই সুপার এল নিনো পুরোদমে আঘাত হানবে। আর আগামী নভেম্বর মাস পর্যন্ত এটির ধ্বংসাত্মক প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে।
বিপজ্জনক এই এল নিনো পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, "বিজ্ঞান খুবই স্পষ্ট। ৯০ শতাংশ নিশ্চিত আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের দোরগোড়ায় আসছে এল নিনো। বিশ্বকে এটিকে জরুরি আবহাওয়া সতর্কতা হিসেবে নিতে হবে।"
বিশ্বের বর্তমান তাপমাত্রা বৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, "উষ্ণ বিশ্বের আগুনে আরও তেল ঢালবে এল নিনো। এটির প্রভাব হবে আরও ভয়াবহ। এল নিনো আরও সামনে এগিয়ে যাবে। সীমান্ত অতিক্রম করবে আরও বেশি ধ্বংসাত্মক গতি নিয়ে।"
এই বিপর্যয় থেকে মুক্তির উপায় বাতলে দিয়ে জাতিসংঘ প্রধান মন্তব্য করেন, "এই সংকটের একমাত্র কার্যকর সমাধান হলো পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রেখে জলবায়ু সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া—যার মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের রক্ষা করা এবং সবার জন্য আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার সুবিধা নিশ্চিত করা।"
বিজ্ঞানীরা এল নিনোর সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে এখন থেকেই বিশ্ববাসীকে সতর্ক করতে শুরু করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, এর বিরূপ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্যের উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে, যা সামগ্রিক খাদ্যের জোগান কমিয়ে বাজারে মূল্যস্ফীতি ঘটাবে। তীব্র খরা এবং অস্বাভাবিক বন্যার জোড়া ধাক্কায় পড়বে বিশ্ব।
এদিকে আবহাওয়াবিদদের তীব্র আশঙ্কা, চলতি ২০২৬ সালেই বৈশ্বিক তাপমাত্রার ইতিহাসের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাতে পারে। তাঁদের মতে, ২০২৬ সালের শেষভাগে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো প্রবল রূপ ধারণ করতে পারে, যার জেরে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তীব্র অনাবৃষ্টি ও খরা এবং আমেরিকা মহাদেশে অতিবৃষ্টির বিপর্যয় নেমে আসবে।
স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণকারী বৈশ্বিক সংস্থা স্কাইফাই জানিয়েছে, তাদের উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন হাই-রেজল্যুশন ইমেজারিতে ইতিমধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে খরার প্রাথমিক ও উদ্বেগজনক লক্ষণ ধরা পড়তে শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতে চার মাসের বর্ষা মৌসুমের ওপর দেশটির সামগ্রিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ শতাংশ নির্ভর করে। কিন্তু ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর সম্প্রতি তাদের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস আরও কমিয়ে দিয়েছে। তীব্র গরমের কারণে সেখানে ধান, সয়াবিন, ডাল, আখ ও ভুট্টার মতো গ্রীষ্মকালীন ফসল রোপণের প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রায় একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছে থাইল্যান্ড ও ফিলিপিন্স, যেখানে জুন-জুলাই মাস হলো প্রধান ধান রোপণের মৌসুম। থাইল্যান্ডের কৃষকরা তীব্র পানির অভাবে দ্বিতীয়বার ধান চাষ করা নিয়ে চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপসহ দেশটির বেশ কিছু অঞ্চলে টানা ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে কোনো বৃষ্টিপাতের দেখা মেলেনি।