
দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা জাতিগত দাঙ্গার ক্ষত দগদগে থাকা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মনিপুরে আবারও এক নৃশংস ও কাপুরুষোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজ্যটির কাংপোকপি জেলায় ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সন্দেহভাজন জঙ্গিদের অতর্কিত হামলায় অন্তত ৩ জন নিরীহ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আগুন দিয়ে সম্পূর্ণ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে ৭টি বসতবাড়ি।
আজ শুক্রবার (৫ জুন) ভোররাতে জেলার লোইবল খুলেন গ্রামে এই রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব চালানো হয় বলে মনিপুরের কুকি-জো উপজাতিদের শীর্ষ সংগঠন ‘কুকি ইনপি মনিপুর’ (কেআইএম) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে।
কুকি ইনপি মনিপুর তাদের বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, আজ ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে এনএসসিএন-আইএম এবং তাদের ছায়া সংগঠন জেডইউএফ (কে)-এর একদল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ক্যাডার হঠাৎ করে ঘুমন্ত গ্রামটিতে অতর্কিত হামলা চালায়। এই কাপুরুষোচিত হামলায় ৩ জন নিরীহ নাগরিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং ৭টি বাড়ি ভস্মীভূত করাসহ সাধারণ মানুষের সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা হয়।
এদিকে কুকি স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন (কেএসও) নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করে জানিয়েছে, নিহতরা হলেন— লোইবল খুলেন গ্রামের বাসিন্দা লেতখঙ্গাম হাওকিপ (৩৪), তাঁর স্ত্রী তিনমেরি হাওকিপ (৩০) এবং একই গ্রামের বাসিন্দা জাংমিনলাল হাওকিপ (৩৪)। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এই ভয়াবহ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও তদন্তের স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ভোররাতের এই বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে কুকি সংগঠনগুলো একে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেছে। একই সঙ্গে কুকি-জো সম্প্রদায়ের ওপর এই হামলার ফলে তৈরি হওয়া যেকোনো ভয়াবহ পরিণতির জন্য তারা কোনোভাবেই দায়ী থাকবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
কুকি ইনপি মনিপুর ভারত সরকার এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছে এই হামলার পেছনে জড়িতদের খুঁজে বের করে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা ঝুঁকিপূর্ণ ও উপান্ত এলাকাগুলোতে বসবাসকারী উপজাতিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২০২৩ সালের মে মাসে মেতেই সম্প্রদায়ের তপশিলি উপজাতি (এসটি) মর্যাদার দাবির বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে মনিপুরে মেতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গার সূত্রপাত হয়েছিল। সরকারি ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘ এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৬০ হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সহিংসতার তীব্রতা আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে, তবে কাংপোকপি, ইমফাল পূর্ব এবং চুরাচাঁদপুরের মতো সীমান্ত জেলাগুলোতে এখনও প্রায়শই এমন অতর্কিত বন্দুক হামলা, অ্যামবুশ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। এই হামলায় অভিযুক্ত নাগা বিদ্রোহী সংগঠন এনএসসিএন-আইএম কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।