
জার্মানির রাজধানী বার্লিনে ব্যতিক্রমী আলু উৎপাদনের কারণে শহরের বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে আলু বিতরণের উদ্যোগে মানুষ ভিড় করেছে। চিড়িয়াখানা থেকে শুরু করে স্যুপ রান্নাঘর, গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্র, কিন্ডারগার্টেন, স্কুল ও গির্জা—সবখানেই পৌঁছেছে টনকে টন আলু। দেশটিতে গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আলু উৎপাদন হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জার্মানির একজন মানুষ বছরে গড়ে ৬৩ কেজি আলু খায়। তবে চলতি বছরের অতিরিক্ত উৎপাদন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্বাভাবিকভাবে তা হজম করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়ভাবে এই পরিস্থিতিকে ‘কার্টোফেল-ফ্লুট’ বা আলু-বন্যা বলা হচ্ছে।
অতিরিক্ত আলু ফেলার বদলে এক কৃষক বিনামূল্যে বিতরণের উদ্যোগ নেন। বার্লিনের বিভিন্ন স্থানে নির্ধারিত কেন্দ্র থেকে মানুষ আলু সংগ্রহ করছে। এই উদ্যোগে স্যুপ রান্নাঘর, গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্র, স্কুল, কিন্ডারগার্টেন, গির্জা ও অলাভজনক সংস্থা যুক্ত হয়েছে। বার্লিন চিড়িয়াখানাও আলু বিতরণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি ফেলে দেওয়া আলু পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং দুই ট্রাক ভর্তি আলু ইউক্রেনে পাঠানো হয়েছে।
শহরের পূর্বপ্রান্ত কাওলসডর্ফ এলাকার শিক্ষক অ্যাস্ট্রিড মার্জ বলেন, “আমি আলু নিতে গিয়েছিলাম এবং ১৫০টির বেশি আলু নিয়ে এলাম। এভাবে বছরের শেষ পর্যন্ত আমার ও প্রতিবেশীদের প্রয়োজন মিটবে।”
‘চার হাজার টন’ নামে এই উদ্যোগের আয়োজন করেছে একটি বার্লিনভিত্তিক সংবাদপত্র ও পরিবেশবান্ধব সার্চ ইঞ্জিন ইকোসিয়া। গত ডিসেম্বরে লাইপজিগের কাছে এক কৃষকের বিক্রি বাতিল হওয়ায় চার হাজার টন অতিরিক্ত আলু বিতরণের প্রস্তাব আসে, সেখান থেকেই উদ্যোগটি শুরু হয়।
শীতের তীব্রতা ও তুষারপাতের মধ্যেও আলু বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গেছে। টেম্পেলহোফার ফেল্ডে আলু সংগ্রহ করতে আসা এক বাসিন্দা জানান, মানুষ একে অপরকে আলু বহন করতে সাহায্য করেছে এবং রান্নার নতুন কৌশল ভাগাভাগি করেছে।
এই উদ্যোগকে ঘিরে জার্মানিতে আলুর ইতিহাস নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে প্রুশিয়ার রাজা ফ্রেডেরিক দ্বিতীয় ‘কার্টোফেলবেফেল’ বা আলু চাষের ফরমান জারি করে আলু ধীরে ধীরে দেশটির প্রধান খাদ্য হয়ে ওঠে।
আলু পুষ্টিতে ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। বার্লিনের তারকা শেফ মার্কো মুলার আলুকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন—ভাজা আলুর খোসা দিয়ে বিশেষ ঝোল ও আলুর ভিনেগ্রেট তৈরি করে। সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেলের আলুর স্যুপও আবার আলোচনায় এসেছে।
তবে এই বিনামূল্যের আলু বিতরণ নিয়ে সমালোচনাও আছে। স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করছেন, এতে বাজারে আলুর সরবরাহ বাড়ায় তাদের উৎপাদিত আলুর দাম কমছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এটি নিয়ন্ত্রণহীন খাদ্যব্যবস্থার প্রতিফলন, যা ১৯৭০-এর দশকের ‘বাটার পাহাড়’ ও ‘দুধের হ্রদ’-এর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
আয়োজকদের ধারণা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই উদ্যোগ শেষ হবে। তবে এখনও প্রায় ৩,২০০ টন আলু বিতরণের অপেক্ষায় রয়েছে।