
বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ধীরগতি ও মন্থর স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)।
রোববার (৪ জানুয়ারি) পিআরআইয়ের ‘মান্থলি ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস (এমএমআই)’ নভেম্বর সংস্করণ প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংস্থাটি এ তথ্য তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি থাকলেও পুনরুদ্ধারের জন্য নীতি-নিশ্চয়তা ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখন অত্যন্ত জরুরি।
অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের সহযোগিতায় পিআরআইয়ের সেন্টার ফর ম্যাক্রোইকোনমিক অ্যানালাইসিস (সিএমইএ) অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক এবং বেসরকারি খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাবিনিময় হারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির কিছুটা মন্থর হওয়ায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে আংশিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। তবে বিনিয়োগ হ্রাস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৩.৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
খাদ্যপণ্যের, বিশেষ করে চালের দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি এখনও ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। ব্যাংকিং খাতে চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের ন্যূনতম হারের কারণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে গেছে।
প্রধান অতিথি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, “অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল নীতিপরিবেশে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে নীতি-নির্ধারণে অনুমানযোগ্যতার ওপর।” তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি, সরবরাহ-পক্ষের সংস্কার ও কার্যকর বাণিজ্যনীতির ওপর জোর দেন এবং বলেন, “অর্থবহ কর সংস্কার ছাড়া সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিতই থাকবে।”
পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার জানান, “নামমাত্র বিনিময় হার প্রায় ১২২ টাকা প্রতি ডলারে স্থিতিশীল থাকলেও প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার (আরইইআর) গত চার মাসে ৬ থেকে ৭ শতাংশ বেড়েছে, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক। স্বল্পমেয়াদে বিনিময় হারের মূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন উভয়ই বাণিজ্যিক প্রভাব ফেলতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, দেশের অন্তর্নিহিত প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা প্রায় ৬ শতাংশ হলেও বর্তমানে বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছালেও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ভারসাম্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।
পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, ২০২৬ সালে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসা বাস্তবসম্মত নয়। বরং অনিশ্চয়তাকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়ে নমনীয় ও দ্রুত অভিযোজনযোগ্য নীতিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও সহিংসতা অর্থনৈতিক টেকসইতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মন্তব্য করেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশ স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকিতে রয়েছে; প্রবৃদ্ধি কমছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে। কঠোর মুদ্রানীতি, রাজস্ব নীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ঋণপ্রবাহ মারাত্মকভাবে সংকুচিত।”
তিনি সুপারিশ করেন, দুর্বল ব্যাংককে সহায়তার পরিবর্তে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর মূলধন জোরদার করা উচিত, যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় সহায়ক হবে।