
প্রায় পাঁচ মাস বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরেই নিজ দল নেপালি কংগ্রেসে নতুন করে বিরোধের মুখে পড়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলটির সাবেক সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা। তাকে আবারও দলের সভাপতি করে তার নেতৃত্বে ১৫তম সাধারণ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন ঘনিষ্ঠ নেতারা। তবে দলের একটি অংশ এর বিরোধিতা করছে।
নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে চলমান সংকট আরও জটিল হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট ১৭ এপ্রিলের রায় পুনর্বিবেচনার অনুমতি দেওয়ার পর। ওই রায়ে গগন থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে দলের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
দেউবা-ঘনিষ্ঠ নেতাদের সামনে এখন দুটি বিকল্প রয়েছে বলে মনে করছেন তারা—সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা অথবা দেউবার নেতৃত্বে সাধারণ সম্মেলন আয়োজন করা।
দেউবার ঘনিষ্ঠ নেতা প্রকাশ শরণ মহাত বলেন, আমরা হয় আদালতের চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারি, অথবা ১৪তম সাধারণ সম্মেলনে শের বাহাদুর দেউবার নেতৃত্বে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিকে গ্রহণ করে সাধারণ সম্মেলনের দিকে এগোতে পারি।
তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই ১৫তম সাধারণ সম্মেলন দেউবার নেতৃত্বেই হওয়া উচিত। বিশেষ সাধারণ সম্মেলনকে ঘিরে দলের মধ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটিকে তিনি একটি ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মহাতের মতে, আদালত আগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণ করায় অপর পক্ষ দেউবার নেতৃত্বে সম্মেলনে রাজি হলে চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা না করেও দলীয় ঐক্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
দেউবার নেতৃত্বে নেপালি কংগ্রেসের বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীকে এক ছাতার নিচে আনা সহজ হবে বলেও মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, দেউবার নেতৃত্বে সবাই একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাবেন এবং কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া কিংবা কোণঠাসা করা হবে না।
পাঁচবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং দুই মেয়াদে নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা প্রায় পাঁচ মাস বিদেশে থাকার পর বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) নেপালে ফেরেন।
বিমানবন্দর থেকে কাঠমান্ডুর চুন্ডেভিতে তার সমর্থকদের যোগাযোগ কার্যালয়ে যান তিনি। সেখানে আগে থেকেই জড়ো হওয়া দলীয় নেতা-কর্মীদের অনুরোধে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন দেউবা।
এ সময় নিজের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ নাকচ করেন তিনি। এসব অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেউবা বলেন, রাজতান্ত্রিক পঞ্চায়েত আমল, রাজা জ্ঞানেন্দ্রর শাসন কিংবা বর্তমান সরকারের সময়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়নি।
দেশে ফেরার আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে দলীয় বিভেদ ও অসন্তোষের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান তিনি। নেপালি কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিরোধ জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে বলেও সতর্ক করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
তরুণ নেতাদের সামনে এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের অযোগ্য বা মূল্যহীন হিসেবে দেখানোর বিরোধিতা করেন দেউবা।
নেপালি কংগ্রেসের বর্তমান নেতৃত্ব সংকটের শুরু জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশেষ সাধারণ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে। ওই সম্মেলনে গগন থাপা দলের সভাপতি নির্বাচিত হন।
পরে নির্বাচন কমিশন থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে বৈধতা দিলে এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যায় দেউবা শিবির।
১৭ এপ্রিল আদালত থাপার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে নেপালি কংগ্রেসের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
এরপর দেউবা শিবির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। প্রাথমিক পর্যালোচনার পর ২২ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট আবেদনটি নথিভুক্ত করে। পরে পুনর্বিবেচনার অনুমতি দেওয়ায় দলটির নেতৃত্ব নিয়ে আইনি জটিলতা ফের সামনে আসে।
তবে দেউবাকে আবার সভাপতি করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ পৌডেল।
তার বক্তব্য, বিশেষ সাধারণ সম্মেলনের বৈধ প্রক্রিয়ায় যে নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে আবার সভাপতি হিসেবে গ্রহণ করে সাধারণ সম্মেলনে যাওয়া আইনগত, প্রক্রিয়াগত ও রাজনৈতিক—কোনো দিক থেকেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
পৌডেল আরও বলেন, দেউবা দুই মেয়াদে দলের সভাপতি ছিলেন। এখন তার উচিত দলীয় গোষ্ঠীগত প্রতিযোগিতার বাইরে থেকে বৃহত্তর দলীয় ঐক্যের জন্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকের শুরুতে গগন থাপা দেউবার দেশে ফেরাকে স্বাগত জানান। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া দেউবা সুস্থ হয়ে দেশে ফেরায় তাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানোর কথা বলেন তিনি।
দলীয় নেতৃত্বের বিরোধের পাশাপাশি দেউবার আইনি জটিলতাও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তিনি বিদেশে থাকার সময় দেশটির অর্থপাচার তদন্ত বিভাগ তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিষয়ে তদন্ত শুরু করে।
দেউবা ও তার স্ত্রী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার বিরুদ্ধে কাঠমান্ডু জেলা আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। তবে ২৫ মে সুপ্রিম কোর্ট তাদের গ্রেপ্তার না করার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার যথেষ্ট আইনগত ভিত্তি নেই। ইন্টারপোলও দেউবা দম্পতির বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তবে অর্থপাচার নিয়ে তদন্ত এখনো চলছে। জুলাইয়ে তদন্তকারীরা বিশেষ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। সেখানে দেউবার ছেলে জয়বীর দেউবার মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২ কোটি ৬০ লাখ নেপালি রুপির একটি লেনদেনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ফলে দেশে ফিরে শের বাহাদুর দেউবার সামনে এখন বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ—দলের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ মেটানো, গগন থাপা শিবিরের সঙ্গে সমঝোতা করা এবং চলমান অর্থপাচার তদন্ত মোকাবিলা করা।