
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এর সরাসরি ধাক্কা লেগেছে জ্বালানি বাজারে। সপ্তাহের শুরুতেই আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ করেই তেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
সোমবার (৯ মার্চ) সকালে এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার পরপরই তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়। দিনের শুরুতেই বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের মূল্য ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী কয়েকটি দেশ উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যার ফলে দামের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।
সোমবার স্থানীয় সময় সকালে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচার দাম বেড়ে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ১১১.০৪ ডলার। আগের দিনের তুলনায় এতে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮.৩৫ ডলার, যা শতাংশের হিসেবে প্রায় ১৯.৮।
অন্যদিকে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এটির মূল্য ১৬.৫০ ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭.৪০ ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় ১৮.২ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকেরা আগেই ধারণা করেছিলেন যে চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করতে পারে। যেহেতু এশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোতে নতুন সপ্তাহের লেনদেন শুরু হয় সোমবার থেকে, সেই হিসাবেই সপ্তাহের প্রথম দিনেই এই পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নেয়।
জেপি মরগানের প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রুস কাসম্যান বলেন, "বিশ্ব অর্থনীতি এখনো মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। আর সেগুলো মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়েই যায়।"
ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "স্বল্পমেয়াদে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে, সংঘাত দ্রুত কমে এলে, তেলের দামও কিছুটা কমতে পারে। নাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।"
এদিকে অয়েল প্রাইস ডট কমের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৫ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ তেল উৎপাদন কমানোর পথে হাঁটছে। ইরাক ও কুয়েত ইতোমধ্যে উৎপাদন কমাতে শুরু করেছে। একই সময়ে কাতার তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি সরবরাহও কমিয়ে দিয়েছে।
ইরাকের বসরা অয়েল কোম্পানির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে রফতানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের তেল সংরক্ষণাগারগুলো পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমিয়ে প্রতিদিন মাত্র "১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেলে" নামিয়ে আনা হয়েছে।
চলমান সংঘাতের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ওই পথে চলাচলের চেষ্টা করা জাহাজগুলোর ওপর ইসলামিক রেভলিউশনারী গার্ড কর্পস আইআরজিসি হামলা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।