
ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার পর, এবার ওয়াশিংটনের কাছে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এক বিশেষ ‘বিনিময় স্থিতিশীলতা সহায়তা তহবিল’ দাবি করেছে পাকিস্তান।
বুধবার (২২ জুলাই) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
ইসলামাবাদের এই নজিরবিহীন আবদার মঞ্জুর হলে চরম আর্থিক টানাপোড়েন ও মুদ্রাস্ফীতিতে ধুঁকতে থাকা পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি ও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যস্থতায় সাফল্যের সাথে কূটনৈতিক কৌশল প্রদর্শনের পরপরই অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের এই প্রস্তাব প্রকাশ্যে আনল পাকিস্তান। এই ভূ-রাজনৈতিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির গুরুত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি ওয়াশিংটন থেকে আর্থিক ফায়দা লোটার পথ তৈরি করেছে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে পাঁচ বছর মেয়াদি এই ১০ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক সহায়তা তহবিল গঠনের সুস্পষ্ট প্রস্তাব পেশ করেছে ইসলামাবাদ।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপিয়ে দেওয়া কঠোর শর্ত মেনে ঋণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে পাকিস্তান। মার্কিন এই বিশেষ ফান্ড ছাড় পেলে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, পাকিস্তানি রুপির ধারাবাহিক দরপতন রোধ হবে এবং বহুপাক্ষিক সংস্থাসমূহের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও কমে আসবে।
তবে স্পর্শকাতর এই প্রস্তাবের বিষয়ে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ কোনো মন্তব্য করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ও সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো সদুত্তর দেয়নি।
পরবর্তীতে পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারির সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব। উক্ত বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য ও আঞ্চলিক উত্তেজনায় পাকিস্তানের অর্থনীতি কীভাবে ঝুঁকিতে পড়ছে তা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়; যদিও বিজ্ঞপ্তিতে সরাসরি ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রার্থনার কথা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানায়, আন্তর্জাতিক ক্যাপিটাল মার্কেটে সহজ প্রবেশাধিকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং বৈশ্বিক ক্রেডিট রেটিং উন্নত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত সহায়তা চেয়েছেন পাক অর্থমন্ত্রী। বৈঠকে দু’পক্ষই বাণিজ্যিক সহযোগিতা জোরদার, মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৌশলগত প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, বর্তমানে আইএমএফের ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি কঠোর ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে পাকিস্তান, যার শর্ত পূরণ করতে গিয়ে দেশটির জনগণকে চড়া করভার বহন এবং সরকারি খাত ছাঁটাইয়ের মতো অপ্রিয় সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের ‘এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফ্যাসিলিটি’ মূলত একটি ব্যতিক্রমী ও বিরল আর্থিক ব্যবস্থা, যা মুদ্রা বিনিময়, ডলার জোগান কিংবা গ্যারান্টির মাধ্যমে যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ও মুদ্রার মান অক্ষুণ্ণ রাখতে কার্যকর সাহায্য করে।
অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মেক্সিকোর সাথে দীর্ঘদিনের সোয়াপ লাইন চুক্তি ছাড়া কেবল ২০০২ সালে উরুগুয়ে এবং সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনা এই বিশেষ মার্কিন ফান্ডের সুবিধা পেয়েছিল।
এর আগে ২০২৩ সালে আইএমএফের সাথে ৩ বিলিয়ন ডলারের একটি জরুরি চুক্তি সই করে দেউলিয়া বা ঋণ খেলাপি হওয়া থেকে কোনোমতে রক্ষা পায় পাকিস্তান। পরবর্তীতে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলাসহ মোট ৭ বিলিয়ন ডলারের বর্ধিত ঋণ অনুমোদন পায় তারা। তবে তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের রিজার্ভের একটি বড় অংশ চীন, সৌদি আরব ও অন্যান্য বন্ধুপ্রতীম দেশের আমানতের ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) ৩.৫ বিলিয়ন ডলার বকেয়া পরিশোধ করতে গিয়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিলে টান পড়েছিল। পরবর্তীতে সৌদি আরব নতুন করে ৩ বিলিয়ন ডলার জমা রাখলে সেই সংকট সামাল দেওয়া হয়।
সার্বিক পরিস্থিতির মাঝে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান আশা প্রকাশ করেছিল যে, আগামী ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছাতে পারে।