
ভারতের রাজধানীতে চলমান ছাত্র আন্দোলনের অংশ হিসেবে 'ককরোচ জনতা পার্টি'র ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচি ঘিরে দিল্লিতে হঠাৎ মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয় টেলিকম অপারেটরগুলো। তবে এ সংক্রান্ত সরকারের কোনো লিখিত বা আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জনসমক্ষে প্রকাশ না করায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে সুশীল সমাজ ও ইন্টারনেট অধিকার রক্ষা সংস্থাগুলোর মধ্যে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরুর আগে সকাল ১০টার দিকেই আকস্মিকভাবে মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর বরাত দিয়ে দ্য ওয়্যার জানিয়েছে, দেশের শীর্ষ টেলিকম সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এয়ারটেল, রিলায়েন্স জিও এবং ভোডাফোন আইডিয়া (ভি)-কে সরকারের পক্ষ থেকে ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করার কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি শীর্ষ টেলিকম প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরকারি নির্দেশিকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে নির্দেশনার পেছনে ঠিক কোন সরকারি মন্ত্রক বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর ছিল, তা স্পষ্ট করা হয়নি। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে সন্ধ্যা ৬টার দিকে সেবা পুনরায় চালু করা হয়।
ইন্টারনেট ও ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা মর্যাদাপূর্ণ সংস্থা ‘ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন’ (আইএফএফ) সরকারের এই গোপনীয় পদক্ষেপের তীব্র ভর্ৎসনা করেছে। আইএফএফ মনে করিয়ে দেয়, সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট রায় রয়েছে—ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিতাদেশের প্রতিটি লিখিত আদেশ প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক। এতে স্পষ্ট কারণ, পরিমিতি ও কতটুকু সময় বলবৎ থাকবে তা উল্লেখ থাকতে হয়। এটি কোনোভাবেই অনির্দিষ্টকালের জন্য নেওয়া যাবে না এবং অবশ্যই তা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতাধীন হতে হবে।
আইএফএফ তাদের এক বিবৃতিতে এই ইন্টারনেট ব্লাকআউটকে আইনি কাঠামোর চরম লংঘন আখ্যা দিয়ে বলে:
"আজকের এই ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনাটিকে যদি আমরা আইনি কাঠামোর নিরিখে বিচার করি, তবে দেখা যায়—আদেশটি অপ্রকাশিত রাখা হয়েছে, যা ‘অনুরাধা ভাসিন বনাম ভারত সরকার’ মামলা এবং ‘সাসপেনশন রুলস, ২০২৪’-এর লঙ্ঘন।"
সংগঠনটি গুরুত্বারোপ করে উল্লেখ করে যে, সরকার যদি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না করে তবে কোনো অনুমোদনপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ এটি জারি করেছে কি না কিংবা রিভিউ কমিটি তা যথাযথভাবে তদারকি করবে কি না—সেটি নিশ্চিত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।
আইএফএফের স্পষ্ট মন্তব্য:
"অপ্রকাশিত আদেশ মানেই জবাবদিহিহীন আদেশ। আদালতের সামনে একে চ্যালেঞ্জ করা যায় না এবং সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক নিশ্চিত করা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার বিষয়টি তখন অর্থহীন বা অলীক হয়ে পড়ে।"
ভারতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের ইতিহাস ও পরিসংখ্যান:
আইএফএফের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বিতর্কিত নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনের সময় দিল্লির জামিয়া নগর, সিলমপুর ও মান্ডি হাউসের মতো এলাকায় ইতিহাসে প্রথমবার মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের সময় গাজিপুর, টিকরি, সিংঘু, মুকারবা চক এবং নাংলোই এলাকায় অনুরূপ ব্ল্যাকআউট চাপানো হয়েছিল।
বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা হ্যাশট্যাগ কিপইটঅন (#KeepItOn) জোটের ২০২৬ সালের মার্চ মাসের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই ভারতে মোট ৬৫ বার ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, ২০১৬ সাল থেকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নথিভুক্ত হওয়া সর্বমোট ২,১০২টি ইন্টারনেট বিভ্রাটের ঘটনার মধ্যে ৯২০টির জন্যই এককভাবে দায়ী ভারত।