
আগের সরকারের সময়ে নেওয়া প্রায় ১ হাজার ৩০০টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য অনিয়ম যাচাই করছে বর্তমান সরকার। প্রতিটি প্রকল্প আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি জানান, এসব প্রকল্পকে ঘিরে কয়েকটি মামলা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় বর্তমানে আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সদস্য রেহানা আক্তার রানুর (সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪) এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আমির খসরু বলেন, আগের ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকার দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে বিপুলসংখ্যক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। এর ফলে এসব ঋণের দায় পরিশোধের বড় চাপ এখন বর্তমান সরকারের ওপর পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘অনেক বিষয় বিচারাধীন এবং অনেকগুলো প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তবে, আমরা প্রতিটি প্রকল্প আলাদাভাবে মূল্যায়ন করছি।’
অর্থমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন পর্যায়ে বাস্তবায়নাধীন প্রায় ১ হাজার ৩০০টি প্রকল্প বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। এরই মধ্যে এসব প্রকল্প পৃথকভাবে পর্যালোচনার কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অনেক প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে, আবার অনেকগুলো মধ্যবর্তী পর্যায়ে রয়েছে।’
প্রয়োজন না থাকলে বাদ, শেষ পর্যায়ের প্রকল্প শেষ হবে
প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা যাচাই করে ইতোমধ্যে কিছু প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তবে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, সেগুলো বাতিল করার সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আমির খসরু বলেন, ‘আমরা অনেক প্রকল্প বাদ দিচ্ছি। আবার এমন কিছু প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় আমাদের তা সম্পন্ন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি বলেন, আগের সরকারের নেওয়া এসব প্রকল্পের বিপরীতে সৃষ্ট আর্থিক দায় এবং নেওয়া ঋণ পরিশোধের দায়িত্বও বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। অতীতে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এতো অল্প সময়ে বাংলাদেশ এর আগে এতো বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়নি। এসব ঋণ পরিশোধ করতে বর্তমান সরকার অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে।’
সরকারি বিনিয়োগে চার নীতি
সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চারটি মৌলিক নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এগুলো হলো অর্থের যথাযথ ব্যবহার বা ‘ভ্যালু ফর মানি’, বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা বা রিটার্ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিষয় বিবেচনা।
তার অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে নেওয়া অনেক প্রকল্পে এসব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাদের অধিকাংশ প্রকল্পে অর্থের যথাযথ ব্যবহার, বিনিয়োগের রিটার্ন, কর্মসংস্থান কিংবা পরিবেশগত বিষয় বিবেচনা করা হয়নি।’
আমির খসরু বলেন, জনগণের অর্থ এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে চায় সরকার, যেখান থেকে পরিমাপযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল পাওয়া যাবে। পর্যাপ্ত সুফল না দিয়ে বাড়তি আর্থিক দায় তৈরি করে—এমন বিনিয়োগ থেকে সরকার বেরিয়ে আসতে চায়।
ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজারেও চাপ
আগের সময় থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া আরও বিভিন্ন আর্থিক ও অর্থনৈতিক চাপ সরকারকে সামলাতে হচ্ছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজারে কথিত অনিয়ম এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে সৃষ্ট ঋণের দায়কে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কথাও উল্লেখ করেন আমির খসরু। তার মতে, বৈশ্বিক এই সংকট দেশের বিদ্যমান কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ‘আজ সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সব দায় বহন করতে হচ্ছে। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সময়কে আরো কঠিন করে তুলেছে।’
জনগণের সুফল নিশ্চিত করাই লক্ষ্য
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি অর্থের বিনিয়োগ থেকে জনগণের জন্য বাস্তব সুফল নিশ্চিত করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, বর্তমানে এই চারটি নীতির ভিত্তিতে যে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা বাংলাদেশের জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনবে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’