একসময় যে নদী ছিল জীবিকার উৎস, আজ সেখানে কোথাও ময়লার স্তূপ, কোথাও স্থাপনা, কোথাও আবার ধু-ধু বালুচর। নদী হারিয়ে যাওয়ার গল্পটি শুধু প্রকৃতির পরিবর্তনের নয়; এর পেছনে আছে দখল, দূষণ, পানিপ্রবাহের সংকট, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং বছরের পর বছর চলা অব্যবস্থাপনা। অনুসন্ধানে উঠে আসে নদী রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে নদীর ওপর চাপ কমছে না।
বাংলাদেশের নদীর গল্প শুরু হয় পানি দিয়ে, কিন্তু শেষ হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে মাটি, বর্জ্য আর দখলের গল্পে।
যে নদীর বুক দিয়ে একসময় নৌকা চলত, এখন সেখানে কোথাও হাঁটুসমান পানি। কোথাও নদীর তলদেশ দেখা যায়। কোথাও নদীর সীমানা দখল করে উঠেছে স্থাপনা। আবার কোথাও নদী আছে কাগজে—বাস্তবে তার জায়গায় গড়ে উঠেছে রাস্তা, বাজার কিংবা বসতি।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ২০২৫ সালের প্রকাশিত নদ-নদীর তালিকা তৈরি হয়েছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা ও নদীকর্মীদের তথ্যের ভিত্তিতে। অর্থাৎ নদীর অস্তিত্ব শনাক্ত ও সংরক্ষণের জন্য রাষ্ট্রের কাছে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে।
তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়—নদী রক্ষার এত উদ্যোগের পরও নদী সংকট কেন কাটছে না?
নদীর মৃত্যু অনেক সময় হঠাৎ হয় না। শুরু হয় তীর দখল দিয়ে।
প্রথমে নদীর পাড়ে একটি ছোট স্থাপনা। এরপর মাটি ফেলে একটু জায়গা বাড়ানো। কয়েক বছর পর সেই জায়গায় তৈরি হয় বড় ভবন বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। নদীর স্বাভাবিক সীমানা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে।
দখলের এই ধারাবাহিকতা নদীকে দুইভাবে আঘাত করে। একদিকে কমে যায় নদীর জায়গা, অন্যদিকে বাধাগ্রস্ত হয় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কার্যক্রমের পটভূমিতেও নদীর তীরভূমি, ফোরশোর ও প্লাবনভূমিতে অবৈধ দখল এবং অবৈধ কাঠামো নির্মাণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ নদী দখল কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি এতটাই গুরুতর যে নদী রক্ষার জন্য গঠিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে পানি দেখলে অনেক সময় বোঝার উপায় নেই, সেই পানির ভেতর দিয়ে একটি শহরের কত বর্জ্য প্রবাহিত হচ্ছে।
গৃহস্থালির বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশনের পানি, প্লাস্টিক এবং শিল্পবর্জ্য—সবকিছুর শেষ গন্তব্য হয়ে উঠছে অনেক নদী।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পয়োনিষ্কাশন, কঠিন বর্জ্য, শিল্পবর্জ্য ও শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য ভূপৃষ্ঠের পানিদূষণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে। নগর এলাকায় শিল্পদূষণ বিশেষভাবে বড় ভূমিকা রাখছে।
ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর অবস্থা এ সংকটের দৃশ্যমান উদাহরণ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নদীর পানির মান পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গার বিভিন্ন পয়েন্টে পানির গুণমান পরীক্ষা করা হয়েছে। ২০২১ সালের তথ্যেও বিভিন্ন স্থানে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রায় বড় পার্থক্য দেখা যায়; কিছু পর্যবেক্ষণে এর মাত্রা শূন্যেও নেমেছিল।
একটি নদীতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হওয়া শুধু পানির মানের সমস্যা নয়। এর অর্থ হলো—নদীর ভেতরের জলজ জীবনের জন্যও পরিবেশ ক্রমশ প্রতিকূল হয়ে উঠছে।
নদী রক্ষার আলোচনায় দখল ও দূষণ বেশি দৃশ্যমান। কিন্তু আরেকটি সংকট অনেক বেশি মৌলিক—নদীর প্রবাহ।
বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থার বড় অংশ আন্তঃসীমান্ত। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ভূপৃষ্ঠের পানির প্রায় ৯০ শতাংশ ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। শুষ্ক মৌসুমে কম বৃষ্টিপাত ও উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে নদীর প্রবাহ কমে যায়।
পানির প্রবাহ কমলে নদীর ওপর একের পর এক চাপ তৈরি হয়।
প্রবাহ কমে গেলে পলি সহজে সরে যেতে পারে না। নদীর তলদেশ ভরাট হয়। চর জাগে। নাব্যতা কমে। এরপর নদী আরও অগভীর হয়ে যায়। অগভীর নদীতে আবার পানির প্রবাহ আরও বাধাগ্রস্ত হয়।
এ যেন একটি দুষ্টচক্র।
পানি কমে → পলি জমে → নদী অগভীর হয় → প্রবাহ আরও কমে → নদী আরও সংকুচিত হয়।
সড়ক, সেতু, শিল্পাঞ্চল, আবাসন—উন্নয়ন প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই উন্নয়ন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে কতটা বিবেচনায় রাখছে?
একটি নদীকে শুধু একটি জলধারা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকে তার তীর, প্লাবনভূমি, খাল, জলাভূমি এবং আশপাশের জীববৈচিত্র্য।
নদীর একটি অংশ বন্ধ করে দিলে তার প্রভাব অন্য অংশেও পড়ে। পানির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে, আবার কোথাও শুকনো মৌসুমে পানির সংকট বাড়তে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বিশ্লেষণেও নগরায়ণ ও শিল্পায়নের সঙ্গে নদীর পানির মানের অবনতির সম্পর্ক উঠে এসেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা অঞ্চলের নদীগুলোর পানির মান খারাপ হওয়ার পেছনে শিল্পের ঘনত্ব, অপর্যাপ্ত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নদী রক্ষায় বাংলাদেশে আইন আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, তালিকা আছে, প্রকল্প আছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ওয়েবসাইটেই নদীর দখল, দূষণ ও নাব্যতা নিয়ে বিভিন্ন সরেজমিন পরিদর্শন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
২০২৫ ও ২০২৬ সালের এসব নথির তালিকায় রূপসা, ময়ূর, নরসুন্দা, আড়িয়াল খাঁ, কুলিক, নাগর, বিলাস, ধলাই, সারি নদীসহ বিভিন্ন নদীর দখল, দূষণ ও নাব্যতার পরিস্থিতি নিয়ে পরিদর্শনের তথ্য রয়েছে।
এখানেই সংকটের আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়।
সমস্যা শনাক্ত হচ্ছে। নদীর নাম জানা যাচ্ছে। কোথায় দখল, কোথায় দূষণ—তারও প্রতিবেদন হচ্ছে। কিন্তু নদীর ওপর চাপ কমছে কতটা?
নদী রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই শুধু—‘দখলদার কে?’ নয়।
প্রশ্ন হলো—দখল হওয়ার পর সেটি সরাতে কত সময় লাগছে? উচ্ছেদের পর জায়গাটি আবার দখল হচ্ছে কি না? দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না? আর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার কাজ কতটা কার্যকর?
নদী পুনরুদ্ধারের অন্যতম আলোচিত পদ্ধতি হলো খনন বা ড্রেজিং। কিন্তু সব নদীর ক্ষেত্রে নির্বিচারে খনন সমাধান নয়।
কারণ নদী একটি চলমান প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। কোথায় কত পলি জমছে, নদীর প্রবাহ কীভাবে বদলাচ্ছে, বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে নদীর আচরণ কেমন—এসব না বুঝে শুধু তলদেশ খুঁড়ে গভীর করলেই নদী দীর্ঘমেয়াদে বাঁচবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং ভুলভাবে খনন করা হলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, তীর ও জলজ প্রতিবেশে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তাই নদী পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে শুধু ‘কত ঘনমিটার মাটি তোলা হলো’—এটি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না।
সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত—নদীতে পানি ফিরল কি না, প্রবাহ ফিরল কি না, জীববৈচিত্র্য ফিরল কি না এবং নদী আবার মানুষের জন্য কার্যকর হলো কি না।