
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় কোন্দল ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্ব পর্যাপ্ত নয়। এর ফলে দলগুলোর নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র ও অভিজাত শ্রেণির প্রভাব বাড়ছে। সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসার সুযোগও এতে সীমিত হয়ে পড়ছে।
তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য সহায়ক নয়। দলগুলোকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
অভ্যুত্থানের পরও বদলায়নি রাজনৈতিক সংস্কৃতি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও রাজনৈতিক সংঘাত ও দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ কেন অব্যাহত রয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতা ও দলীয় কোন্দল দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশেষ করে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ক্ষমতা দখল ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতায় এসব প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষ আশা করেছিল, পুরোনো রাজনৈতিক চর্চার অবসান ঘটবে এবং নতুন ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরেও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও বিরোধের চিত্র নিয়মিত উঠে আসছে।
গবেষণায় সাতটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রের সঙ্গে দেশের সংবিধানের সাংঘর্ষিক অবস্থানের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি দলগুলোর নাম জানান। সেগুলো হলো জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ)।
১০ দলের কাছ থেকে মেলেনি প্রয়োজনীয় তথ্য
গবেষণার জন্য ১০টি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি কেন, জানতে চাইলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল। লিখিত চিঠি পাঠানো, টেলিফোনে যোগাযোগ এবং দলীয় কার্যালয়ে সরাসরি গিয়েও তথ্য চাওয়া হয়। কিন্তু দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি।
তথ্য না দেওয়া দলগুলোর মধ্যে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগও রয়েছে বলে জানান তিনি।
মনোনয়ন পেতে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য
রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন বাণিজ্য ও নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব নিয়ে আলোচনায় ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গবেষণায় মনোনয়ন বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁদের কয়েকজন জানিয়েছেন, তৃণমূল পর্যায়েও একজন প্রার্থীর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত ব্যয়ের অসামঞ্জস্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থের উৎস এবং কারা এসব দলকে অর্থায়ন করছে, সে সম্পর্কে জানার সুযোগ খুবই সীমিত। অধিকাংশ আর্থিক লেনদেন প্রকাশ্যে না হওয়ায় অর্থের প্রকৃত উৎস ও বৈধতা যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল পরিচালনা করতে উল্লেখযোগ্য অর্থের প্রয়োজন হয়। তাই অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বন্ধ না করে কোথা থেকে এবং কী প্রক্রিয়ায় অর্থ আসছে, তা স্বচ্ছ ও বৈধ কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা জরুরি।
এ জন্য নির্বাচন কমিশন, আইনপ্রণেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার কিংবা নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি। রাজনৈতিক দলের অর্থায়নের পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
গবেষণায় রাজনৈতিক সহিংসতার যে তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, তার উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ক্ষেত্রে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুসরণ করা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সংঘর্ষ এবং একই দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধে নিহত ও আহত নেতাকর্মীদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হতাহত ব্যক্তিদের এই হিসাবের মধ্যে রাখা হয়নি বলে জানান তিনি।
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে শুধু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাই অংশ নেননি, সাধারণ মানুষও ব্যাপকভাবে যুক্ত ছিলেন। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সংঘাতের পরিসংখ্যানের সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থানের হতাহতের তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন আগে থেকেই অবগত থাকার পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এসব অনিয়ম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অনেকেরই ধারণা রয়েছে। তবে গবেষণার মাধ্যমে তথ্যগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্কার নিয়ে কাজ করা এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আনা।
তিনি বলেন, বিদ্যমান আইন থাকার পরও কেন সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না, সেই ব্যাখ্যা রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনকেই দিতে হবে।