
জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম পাঁচ মাসেই দেশ পরিচালনায় এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের চিত্র সামনে এনেছে নতুন সরকার। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, কূটনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে গত ১৫০ দিনে দৃশ্যমান ও উলখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
শনিবার বিকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারের পাঁচ মাসপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
মাহদী আমিন তাঁর বক্তব্যে সরকারের পথচলার মূল ভিত্তিগুলো তুলে ধরে বলেন, "গত পাঁচ মাসে জনগণের আস্থা ও সমর্থন, ইশতেহারের আলোকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ রক্ষা, স্বল্প সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, জনগণের স্বাধীনতা ও দেশের সার্বভৌমত্বের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব-এই ৫টি দিক দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। এটি একটি মানবিক, বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ সুগম করেছে।"
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রধান প্রধান মাইলফলক ও আইনি সাফল্যগুলো সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে বিচারিক ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় মাত্র ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার বিষয়টি জানানো হয়। এছাড়া নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাসমূহের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করে মাত্র এক মাসে ১০টি রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
পাশাপাশি, দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে আত্মগোপনে থাকা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অন্যতম হত্যাকারী মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যিনি বর্তমানে সেনা হেফাজতে রয়েছেন। বহুল আলোচিত তনু ও শরিফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার আসামিদের পাশের দেশ থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দুবাইতে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আনুষ্ঠানিকতা চলমান।
আইনগত ও সংসদীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে ‘জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইন’ পাশ করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করে সংশোধনী বিল পাশ এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সক্রিয় রাখা হয়েছে। সংসদীয় কার্যক্রমের প্রথম ২৫ কার্যদিবসে রেকর্ড ৯৪টি বিল পাশ করে বিভিন্ন জরুরি অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপান্তর করা হয়েছে।
জনকল্যাণ ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রিপেইড মিটারে ধার্যকৃত মাসিক চার্জ তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ইউনিট গঠনের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং রাজধানী ঢাকায় পরিবেশবান্ধব ২৫০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অত্যাধুনিক এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তি এবং চট্টগ্রাম বন্দরে স্বয়ংক্রিয় কার্গো রিলিজ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার যানজট নিরসনে ৪টি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল মহানগরের সীমানার বাইরে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নতুন কিছু সিদ্ধান্ত জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এখন থেকে যেকোনো সরকারি অনুষ্ঠানে ব্যানার-ফেস্টুনে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৬-২৭ সালকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা, প্রাথমিক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট পুনরুজ্জীবিতকরণ এবং শিক্ষার্থীদের মেধা বৃত্তি বৃদ্ধির মতো নানা প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মাহদী আমিন বর্তমান সরকারের সামগ্রিক লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, "দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার মূলত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা এবং বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয়সাশ্রয় ও দুর্নীতিমুক্ত পর্যালোচনা নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসন, বিপর্যস্ত ও লুণ্ঠিত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বিভিন্ন ধরনের বিনির্মাণ চলমান রয়েছে।"
বক্তব্যের সূচনায় জুলাই আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে মাহদী আমিন বলেন, "দুই বছর আগে আজকের এই সময়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছিল। ন্যায্য অধিকার আদায়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী গুলি করে হত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। আমরা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সব শহীদকে এবং মহান আল্লাহর দরবারে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।"
সংবাদ সম্মেলনে জনগণের সর্বস্তর তথা তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত তথ্যের অবাধ ও স্বচ্ছ প্রবাহ নিশ্চিত করতে সরকারের তথ্যের বিকেন্দ্রীকরণ নীতির কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বলেন, "বিএনপি সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। কিন্তু কিছু সাংবাদিক বিশেষ করে কিছু মোবাইল সাংবাদিক নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের এ ধরনের অপসাংবাদিকতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।"
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির সুচারু সঞ্চালনায় উক্ত সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এবং শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীনসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।