
ইনকিলাব মঞ্চের তৎকালীন আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন। বুধবার (১৫ জুলাই) তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির পক্ষ থেকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত দিন থাকলেও তা দাখিলে আবারও ব্যর্থ হয়েছে তারা।
এ নিয়ে ১৮ বারের মতো পেছাল বহুল আলোচিত এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা। তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম আগামী ২০ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন নির্ধারণ করেছেন।
বিজয়নগরে হামলা ও সিঙ্গাপুরে মৃত্যু
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ১২ ডিসেম্বর। ওই দিন ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় গণসংযোগ চালাচ্ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি। এমন সময় একটি চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
গুরুতর জখম অবস্থায় হাদিকে প্রথমে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে এবং শেষ দফায় উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই সংগঠক।
হত্যাকাণ্ডের পর, ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। হাদির মৃত্যুর পর মামলাটিতে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (হত্যা মামলা) যুক্ত করা হয় এবং তদন্তের ভার দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে।
ডিবির অভিযোগপত্র ও সিআইডির অধিকতর তদন্ত
গত ৬ জানুয়ারি সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি ও সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রথম অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয় ডিবি পুলিশ। তবে ডিবির দেওয়া এই অভিযোগপত্রে অসন্তোষ প্রকাশ করে সংক্ষুব্ধ পক্ষ ইনকিলাব মঞ্চ। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটির অধিকতর তদন্তের জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন।
অভিযোগপত্রে নাম থাকা ১৭ জন আসামি হলেন:
ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ
হুমায়ুন কবির (ফয়সালের বাবা)
হাসি বেগম (ফয়সালের মা)
সাহেদা পারভীন সামিয়া (ফয়সালের স্ত্রী)
ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (ফয়সালের শ্যালক)
মারিয়া আক্তার লিমা (ফয়সালের বান্ধবী)
কবির
নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল
সিবিয়ন দিউ
সঞ্জয় চিসিম
আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু
ফয়সাল
আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ
তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী
ফিলিপ স্নাল
মুক্তি মাহমুদ
জেসমিন আক্তার
অভিযুক্তদের মধ্যে ফয়সাল করিম মাসুদসহ তালিকার শেষ পাঁচজন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
মামলার পূর্বতন তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ তাঁর দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছিলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই’ হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া দেশের আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং সাধারণ ভোটারদের মনে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করতেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল বলে ডিবির তদন্তে উঠে আসে।
এদিকে, একটি স্পর্শকাতর হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দফায় দফায় ১৮ বার পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আইনি অঙ্গন ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে নেপথ্যের কুশীলবদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন আইনজীবী ও সাধারণ নাগরিকেরা।