
কোনো প্রশাসনিক বা নির্বাহী আদেশের বলে নয়, বরং সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রাষ্ট্র ক্ষমতার জোরে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী বর্তমান সরকার নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত ‘গণ-অভ্যুত্থানের বাঁক বদলের দিন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন।
ব্যক্তি হাসিনার পাশাপাশি বিচার হবে দলেরও
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রয়োজনীয় আইনি পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে শুধু ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনাই নন, বরং দল বা সংগঠন হিসেবেও আওয়ামী লীগকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এবং বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা আইনিভাবে সম্ভব হবে। তিনি সংবিধানের ধারা উল্লেখ করে বলেন, দেশের সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদেও গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কোনো সংগঠনের বিচার করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন:
“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নাৎসি বাহিনী ও গেস্টাপোকে যেভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের দায়ও আইনি প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করা হবে।”
শেখ হাসিনাকে ফেরাতে আনুষ্ঠানিক চিঠি, গ্রেপ্তার বেনজীর
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচারের ব্যাপারে সরকারের অনড় অবস্থানের কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দেশে ফিরিয়ে আনার সাথে সাথেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং আদালতের দেওয়া রায় কার্যকর করা হবে।
এছাড়া বিদেশে আত্মগোপনে থাকা সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও পদস্থ কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
জুলাই বিপ্লবের কৃতিত্ব ও রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ
বিগত জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই গণ-অভ্যুত্থানের একক কোনো কৃতিত্ব কোনো ব্যক্তি বা দলের একার নয়। দেশের আপামর সাধারণ মানুষ জীবন বাজি রেখে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিল এবং তাদের এই আত্মত্যাগই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ছিল।
ভবিষ্যতে যেন আর কোনো স্বৈরাচারী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে দেশের গণতন্ত্র হরণ করতে না পারে, সেজন্য সরকার রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সাথে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ‘গণভবন’-কে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে, যা স্বৈরাচারের করুণ পরিণতি সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করবে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, জুলাই গণ-আন্দোলনে প্রথম সারিতে থাকা বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধি এবং আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। সভার সমাপ্তিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।