
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে চলছে লাশের মিছিল। গত ছয় মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিবর্ষণ ও হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন বাংলাদেশি নাগরিক। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের এক অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সীমান্তে বিএসএফের বর্বরতা এবং দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সহিংসতার এই উদ্বেগজনক চিত্র।
দেশের ১৬টি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকের সংবাদ, নিজস্ব অনুসন্ধান ও ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এই মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
রক্তাক্ত সীমান্ত: প্রাণহানি ও আটকের পরিসংখ্যান
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সীমান্তে বিএসএফের ৩২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৯ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ৩৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৪ জন সরাসরি গুলিবিদ্ধ হন।
২০২৫ এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন মাসের সীমান্ত পরিস্থিতির তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
বিএসএফের হামলা: ২০২৬ সালে হামলার ঘটনা ঘটেছে ৩২টি, যা গত বছর (২০২৫) ছিল ৪০টি।
বাংলাদেশি নিহত: চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে নিহত হয়েছেন ৯ জন, গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১৪ জন।
আহত: চলতি বছর আহত হয়েছেন ৩৫ জন (যার মধ্যে ১৪ জন গুলিবিদ্ধ), গত বছর আহত হয়েছিলেন ২০ জন।
আটক: ২০২৬ সালে বিএসএফের হাতে আটক হয়েছেন ৩৮ জন, গত বছর আটক হয়েছিলেন ২৭ জন।
পুশ-ইন: চলতি বছর ১৭৩ জনকে জোরপূর্বক পুশ-ইন করা হয়েছে (গত বছরের প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত তথ্য ছিল না)।
পুশ-ইন প্রতিরোধ: চলতি বছর ৪১৬ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হলে তা প্রতিহত করা হয় (গত বছরের প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত তথ্য ছিল না)।
এ ছাড়া সিলেট সীমান্তে খাসিয়া সম্প্রদায়ের গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন এবং সীমান্ত এলাকা থেকে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
অপরদিকে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে ১ জন নিহত, ৫ জন আহত ও ৫ জন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ৮০ জনকে আটক করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে ৬ জন নিহত এবং ৩ জন আহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫৬ জনের মৃত্যু, শীর্ষে বিএনপির অন্তর্কোন্দল
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ মাসে দেশজুড়ে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, দলীয় কোন্দল ও নির্বাচনী সহিংসতায় ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ৮৩০টি পৃথক রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় আহত ও হামলার শিকার হয়েছেন ৫ হাজার ২৪৬ জনেরও বেশি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। অথচ ২০২৫ সালের ঠিক একই সময়ে ৫২৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৯ জন নিহত এবং ৪ হাজার ১২৪ জন আহত হয়েছিলেন।
নিহত ৫৬ জনের রাজনৈতিক পরিচয়:
বিএনপি: ৩৭ জন (৬৬ শতাংশ)
জামায়াত: ৬ জন (১১ শতাংশ)
আওয়ামী লীগ: ৩ জন
অন্যান্য ও চরমপন্থী: ৯ জন
সাধারণ নারী: ১ জন
সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট ৮৩০টি সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ৬৭৩টি (৮১ শতাংশ) ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং অন্য দলের সাথে তাদের সংঘর্ষের কারণে। এর মধ্যে বিএনপির নিজস্ব কোন্দলে ২৭৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ২ হাজার ৯২ জন আহত হন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ২৯০টি ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ১ হাজার ৮৫২ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ৭ জন। দুষ্কৃতকারীদের অতর্কিত হামলায় বিভিন্ন দলের আরও ৩৮ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।
সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ও নারী হেনস্তা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ৬ মাসে দেশজুড়ে ৩৯৬টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন। এই সময়ে ১টি আওয়ামী লীগ, ২টি জামায়াত এবং ৯টি বিএনপি সমর্থক পরিবারের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া নির্বাচনকেন্দ্রিক ১২টি ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নারী হেনস্তার শিকার এবং ৬ জন নারী আহত হয়েছেন। লাঞ্ছিত নারীদের মধ্যে ১৭ জন জামায়াত সমর্থক এবং ১ জন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমর্থক ছিলেন।
মামলা ও গণগ্রেপ্তার
রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কমপক্ষে ১৪৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩ হাজার ২৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ২৪ হাজার ৫১৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারের চিত্র:
মোট রাজনৈতিক গ্রেপ্তার: ৩,০৬৭ জন
আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী: ২,৪১৫ জন
বিএনপি নেতাকর্মী: ৪৯৭ জন
জামায়াত নেতাকর্মী: ১০৯ জন
এনসিপি নেতাকর্মী: ২৬ জন
এছাড়া এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানে দেশজুড়ে ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মত প্রকাশে বাধা
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে স্বাধীন মত প্রকাশের ওপর হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ৬ মাসে অন্তত ৪০টি শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাধা সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনায় ৩১১ জন আহত এবং ৩৮ জনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পথচারী এবং রাজনৈতিক কর্মীরা রয়েছেন।