
দীর্ঘ ১৪ বছরের খরা কাটিয়ে বাংলাদেশের নারী পর্বতারোহণে যুক্ত হলো এক নতুন ও গৌরবময় অধ্যায়। তৃতীয় বাংলাদেশি নারী এবং অষ্টম বাংলাদেশি পর্বতারোহী হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৯ মিটার) জয় করেছেন নুরুননাহার নিম্নি।
আজ বুধবার (২৭ মে) নেপালের স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে তিনি সফলভাবে এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেন এবং পরম গৌরবে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেন। নেপালভিত্তিক অভিযান ব্যবস্থাপনা সংস্থা ‘৮কে এক্সপেডিশন’ (8K Expeditions)-এর পক্ষ থেকে অ্যাঙ তেম্বা শেরপা আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক ও গৌরবময় তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের (বিএমটিসি) সভাপতি ও এভারেস্ট আরোহী ইকরামুল হাসান শাকিল নুরুননাহার নিম্নির এই অনন্য সাফল্যের খবরটি দেশবাসীকে জানান।
চূড়ান্ত অভিযানের রুদ্ধশ্বাস বিবরণ
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চূড়ান্ত আরোহণের লক্ষ্যে গত ২৫ মে নিম্নি ক্যাম্প-২ (৬,৪০০ মিটার) থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং রাতে ক্যাম্প-৩ (৭,২০০ মিটার) এ অবস্থান করেন। ২৬ মে ভোরে তিনি ক্যাম্প-৩ থেকে রওনা হয়ে দুপুর আড়াইটা নাগাদ ডেথ জোন খ্যাত ক্যাম্প-৪-এ পৌঁছান। সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নেওয়ার পর তিনি চূড়ার উদ্দেশে তাঁর চূড়ান্ত ‘সামিট পুশ’ বা অভিযান শুরু করেন। সারারাত তীব্র ঠান্ডা, দুর্গম ও প্রতিকূল পথ পেরিয়ে আজ বুধবার ভোরে তিনি এভারেস্টের শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেন। এই রুদ্ধশ্বাস অভিযানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন গাইড শেরপা দাওয়া নুপু শেরপা ও লাকপা থিনদুক শেরপা।
এর আগে গত ২৩ মে ক্যাম্প-৪ থেকে তিনি একবার চূড়ার দিকে রওনা দিলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে নিচে নেমে আসেন। তবে হার না মেনে ক্যাম্প-২-এ অপেক্ষা করে আবহাওয়া অনুকূলে আসতেই ২৫ মে পুনরায় আরোহণ শুরু করেন তিনি।
ইতিহাসের পাতায় নিম্নি
২০১২ সালে নিশাত মজুমদার (১৯ মে) ও ওয়াসফিয়া নাজরীন (২৬ মে) প্রথম ও দ্বিতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখেছিলেন। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছর আর কোনো বাংলাদেশি নারী এই কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেননি। ২০২৬ সালের এই মে মাসে নুরুননাহার নিম্নি সেই অপেক্ষার অবসান ঘটালেন। তিনি চলতি বছরের একমাত্র বাংলাদেশি এভারেস্টজয়ী।
রংপুরের মেয়ে থেকে এভারেস্টের চূড়ায়
নুরুননাহার নিম্নির বেড়ে ওঠা রংপুরে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব (Geology) বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই পাহাড়ের প্রতি তাঁর তীব্র ঝোঁক ছিল। ভুটান, ভারতের সিকিম এবং নেপালের বিভিন্ন পাহাড়ে ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ২০২২ সালে ভারতের দার্জিলিংয়ের ‘হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট’ থেকে তিনি পর্বতারোহণের ওপর পেশাদার প্রশিক্ষণ নেন। বর্তমানে তিনি পূবালী ব্যাংক পিএলসি-এর জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন এবং তাঁর এই ঐতিহাসিক অভিযানের মূল স্পনসরও ছিল এই প্রতিষ্ঠানটি।
নিম্নি এভারেস্ট জয় করায় দেশের পর্বতারোহণ কমিউনিটিসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। তাঁর এই অদম্য সাহসিকতা বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।