
ভারতের ভোটার তালিকায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে বিরোধী দলগুলোর জোট ইন্ডিয়া। এ দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশে অংশ নিয়েছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধীসহ জোটের শীর্ষ নেতারা। অন্যদিকে বিরোধীদের কর্মসূচির পাল্টা হিসেবে রাজধানীতে পৃথক পদযাত্রা ও সমাবেশ করছে ক্ষমতাসীন বিজেপি।
রোববার (১ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিরোধী জোটের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ২০ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং ভোটার তালিকায় কারসাজির অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অধিবেশন চলাকালে একটি প্রস্তাবও গ্রহণ করেছে জোটটি।
দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধীদের সমাবেশকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি ও রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বামপন্থী দলগুলোরও সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপাল কর্মসূচিটির নাম দিয়েছেন ‘চলো দিল্লি, ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’। তিনি অভিযোগ করেন, বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম চলছে।
রাহুল গান্ধীর ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নির্ভয়ে প্রশ্ন তুলছেন রাহুল। একই সঙ্গে সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহি আদায়ের চেষ্টা করছেন তিনি।
নিরাপত্তায় মোতায়েন ১০ হাজার সদস্য
বিরোধীদের সমাবেশ ঘিরে রামলীলা ময়দান ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রায় ১০ হাজার পুলিশ, কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) এবং র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (র্যাফ) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা রোহিত রাজবীর জানান, পুরো এলাকাকে নজরদারির আওতায় রাখতে ২০০ থেকে ২৫০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আয়োজকদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণকক্ষও রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আয়োজক ও পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
এদিকে সাংবাদিক ও আম আদমি পার্টির সাবেক নেতা আশুতোষ বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও আন্দোলনের অধিকার সবার রয়েছে। তাঁর মতে, অহিংস সত্যাগ্রহ ও গণআন্দোলনের মাধ্যমেই ভারত স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তাই প্রতিবাদে আপত্তির কিছু নেই, তবে তা অবশ্যই শান্তিপূর্ণ হতে হবে। সহিংস কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
'বিরোধীদের আন্দোলন রাজনৈতিক নাটক'
ইন্ডিয়া জোটের কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ বিজেপি। দলটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা বিরোধীদের এই আয়োজনকে রাজনৈতিক নাটক, অযৌক্তিক কর্মকাণ্ড ও বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, বিরোধীরা কী ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে এগোতে চায়, তা জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়। তাঁদের এই সমাবেশ মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি আয়োজন।
অন্যদিকে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করে আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
অভিজিৎ বলেন, তাঁদের প্রথম যন্তর মন্তরের আন্দোলনে মমতা যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা তিনি ভুলে যাননি। তরুণদের বিভিন্ন আন্দোলনের প্রতিও সবসময় তাঁর সমর্থন ছিল। এমনকি সৌরভ ও আশুতোষকে দিল্লি পুলিশ গ্রেপ্তার করার সময়ও মমতা তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৮৪ সালের দাঙ্গার স্মরণে বিজেপির পদযাত্রা
বিরোধী জোটের কর্মসূচির পাশাপাশি ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে পৃথক পদযাত্রার আয়োজন করেছে বিজেপি। পশ্চিম দিল্লির হরি নগর বাস ডিপো থেকে তিলক নগর মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত এই পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এতে অংশ নিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, হর্ষ মালহোত্রা, এইচ এস ফুলকা, মঞ্জিন্দর সিং সিরসা এবং সংসদ সদস্য বাঁশুরি স্বরাজ। কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তাঁরা কংগ্রেসের সমালোচনা করেন।
রাজনৈতিক কর্মসূচির ফলে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির আশঙ্কা
দিল্লিতে একই সময়ে দুটি রাজনৈতিক কর্মসূচি চলায় কেন্দ্রীয় রাজধানীর পাইকারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে চাঁদনি চক, সদর বাজার, দরিয়াগঞ্জ ও কাশ্মীরি গেটের ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
অটোমোটিভ পার্টস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিনয় নারং বলেন, ব্যবসায়ীরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁরা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের বিরোধীও নন। তবে আন্দোলনের জন্য নির্ধারিত সময় ও স্থান নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে। এসব কর্মসূচির কারণে আশপাশের বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংগঠনটির সহসভাপতি রবীন্দ্র সিং কোহলি বলেন, এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন দিনমজুর ও মালামাল বহনের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকেরা। দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ রুপি আয় করে যাঁরা পরিবারের খরচ চালান, তাঁদের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ধর্মপাল রত্রের আশঙ্কা, কর্মসূচির কারণে ব্যবসায়ীদের মোট ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কেনাকাটার আহ্বান রাহুলের
ব্যবসায়ীদের ক্ষতির আশঙ্কার বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সমাবেশের পাশাপাশি আশপাশের দোকানপাট থেকেও কেনাকাটা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাহুলের বক্তব্য, প্রতিবাদ, পদযাত্রা ও সমাবেশের পাশাপাশি কেনাকাটা করলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও লাভবান হবেন। তাঁর দাবি, বিরোধীদের কর্মসূচিতে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। বিজেপি রাজনৈতিকভাবে চাপে থাকায় এ ধরনের আশঙ্কার কথা ছড়িয়ে দিচ্ছে।