
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরান খানকে কেন্দ্র করে দেশটির সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চলমান রাজনৈতিক সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা সত্ত্বেও ইমরানের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। বরং জনজীবন থেকে তাঁকে দূরে রাখার নানা উদ্যোগের মধ্যেও তাঁর সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ ও রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
কারাগারে থাকা এই নেতার মুক্তির দাবিতে আগামী রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানী ইসলামাবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং ইসলামাবাদমুখী মার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তাঁর দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। কর্মসূচিকে ঠেকাতে কয়েক দিন আগেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে কনটেইনার বসিয়ে যান চলাচল বন্ধ করার প্রস্তুতি শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। এর পাশাপাশি বিক্ষোভের আগেই ইমরানের দুই বোনসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইমরানের নাম উচ্চারণেও বিধিনিষেধ
ইমরান খানকে কেন্দ্র করে সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রভাব পড়েছে পাকিস্তানের গণমাধ্যমেও। দেশটির টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে তাঁর নাম সরাসরি না নিয়ে অনেক সময় তাঁকে পিটিআইয়ের ‘প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আদিল মালিকের মতে, ইমরানের জনপ্রিয়তা এবং সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে পাকিস্তান একধরনের অচলাবস্থায় আটকে রয়েছে।
ইমরানের সমর্থকদের চোখে তিনি সামরিক প্রভাবনির্ভর রাজনীতির বিকল্প। অন্যদিকে সামরিক নেতৃত্বের ধারণা, ইমরানের রাজনৈতিক প্রভাব রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক থেকে বিরোধ
২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় ইমরান খানের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা হারান ইমরান। এরপর ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। দুর্নীতি থেকে সন্ত্রাসবাদ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং বিভিন্ন মামলায় সাজাও দেওয়া হয়েছে।
তবে ইমরানের দল এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে। তাঁর দেওয়া অধিকাংশ দণ্ড পরবর্তী সময়ে স্থগিত হয়েছে অথবা আপিলের মাধ্যমে বাতিল হয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর সামরিক স্থাপনায় হামলা
২০২৩ সালে ইমরান খান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর সমর্থকেরা লাহোরের কর্পস কমান্ডার হাউসসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালান। এর পর দেশজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয় এবং হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়।
পরের বছর, ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইমরানপন্থীরা আবার ইসলামাবাদে মিছিল বের করলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করে পিটিআই ও প্রত্যক্ষদর্শীরা।
বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন
ইমরানের রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থা এবং নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৪ সালে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের ছয় বিচারক গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে বিচারিক সিদ্ধান্তে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ করেন। একই বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পিটিআইকে দলীয় প্রতীক ‘ক্রিকেট ব্যাট’ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এরপরও ইমরানপন্থী প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসনে জয় পান। বিরোধী দল ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে সামরিক প্রভাবের মাধ্যমে শাহবাজ শরিফ সরকার গঠিত হয়।
আসিম মুনিরের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ
এদিকে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্রিয় রয়েছেন। তবে দেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তাঁর সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
কারাগারে থেকেও ইমরানের উপস্থিতি
পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় ট্রাক, রিকশা ও দোকানে ইমরান খানের ছবি দেখা যাচ্ছে। তাঁর কারাবন্দী নম্বর ‘৮০৪’-ও বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি ইমরানের বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে।
ফলে ইমরান খানকে কারাগারে রেখে তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও প্রভাব কমিয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে, তা এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল দিয়েছে কি না—পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেই প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে।