-6ab6a78dbb83d.webp)
হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও রাহাজানিসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নরসিংদী শহরের মদের দোকান বন্ধের দাবি জানিয়েছেন জেলা যুবদলের সভাপতি ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসিন হোসেন বিদ্যুৎ। এরই মধ্যে জনরোষের পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার সন্ধ্যায় ওই মদের দোকানে তালা লাগানো হয়েছে।
সম্প্রতি নরসিংদী শহরের কেন্দ্রস্থলে থাকা একটি লাইসেন্সধারী দেশীয় মদের দোকানে বিনামূল্যে ১০ লিটার মদ না দেওয়াকে কেন্দ্র করে দোকানের কর্মচারী তানভীর আহমেদ রাব্বির গায়ে প্রকাশ্য দিবালোকে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
গুরুতর দগ্ধ রাব্বিকে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে আইসিইউতে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বৃহস্পতিবার বিকেলে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর নরসিংদীজুড়ে ক্ষোভ
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর নরসিংদীজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে নরসিংদী শহরের মদের দোকান বন্ধের দাবি সামনে আনেন মহসিন হোসেন বিদ্যুৎ।
তিনি বলেন, ১৯৯৯ সালে নরসিংদীর এই মদের দোকানে বিষাক্ত মদপানের ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওই ঘটনায় ১১৩ থেকে ১১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। একই সময়ে একাধিক ব্যক্তি স্থায়ীভাবে অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্ববরণ করেছিলেন।
তার বক্তব্য, এমন একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির পরও শহরের জনবহুল এলাকায় কীভাবে মদের দোকানটি বহাল তবিয়তে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জনরোষের মধ্যে দোকানে তালা
শহরের মধ্যে প্রকাশ্যে মদ বিক্রির বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠলে যুবসমাজসহ সর্বসাধারণের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে শুক্রবার সন্ধ্যায় দোকানটিতে তালা লাগিয়ে দেন জেলা যুবদল সভাপতি ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসিন হোসেন বিদ্যুৎ এবং জেলা ছাত্রদল সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান নাহিদ।
যেভাবে আগুনে পুড়লেন রাব্বি
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নরসিংদী শহরের বাজির মোড় এলাকায় থাকা লাইসেন্সধারী দেশীয় মদের দোকানে বিনামূল্যে ১০ লিটার মদ দাবি করেন আবাসিক হোটেল নিরালার মালিক জাহাঙ্গীর সরকারের ছেলে জাহিদ সরকারসহ কয়েকজন।
দোকান থেকে মদ দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে কাউন্টারে থাকা কর্মচারী তানভীর আহমেদ রাব্বির (৩০) শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয় তাকে।
আইসিইউতে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বৃহস্পতিবার বিকেলে রাব্বির মৃত্যু হয়।
গ্রেপ্তার দুইজন, মামলা করেছেন রাব্বির মা
এ ঘটনায় রাব্বির মা মিনু বেগম বাদী হয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানায় মামলা করেছেন। মামলায় জাহাঙ্গীর সরকার ও তার ছেলে জাহিদ সরকারসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার পর জাহাঙ্গীর সরকার এবং কাজী তৌফিক আহমেদ ওরফে পিয়াসকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মদের দোকান ঘিরে আইনশৃঙ্খলা অবনতির অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, মদের দোকানটি চালু থাকার কারণে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। মদের নেশায় আসক্ত হয়ে যুবসমাজের একটি অংশ চুরি, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ তাদের।
এ কারণে শহরের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই চাপা ক্ষোভ রয়েছে। এর পাশাপাশি ১৯৯৯ সালের ৭ মে নরসিংদীর এই মদের দোকানে বিষাক্ত মদপানের ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনাটিও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনায় রয়েছে।
‘শিক্ষার্থীরা বিপথে চলে যেতে পারে’
নরসিংদী জেলা যুবদলের সভাপতি ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসিন হোসেন বিদ্যুৎ বলেন, এই মাদকের কারণে শহরে চুরি, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, নেশার জন্য প্রকাশ্যে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, যা একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশে হতে পারে না।
মহসিন হোসেন বিদ্যুৎ আরও বলেন, নরসিংদী সরকারি কলেজসহ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিসন্নিকটে এই মাদক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে দেশের আগামী প্রজন্ম তথা শিক্ষার্থীরা বিপথে চলে যেতে পারে।
তার ভাষ্য, খুনখারাবি, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই বন্ধে শহরের মদের দোকান বন্ধ করা জরুরি। এ কারণে তিনি মদের দোকানটি বন্ধের জোর দাবি জানান।
মালিক-ম্যানেজারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে দেশীয় মদের দোকানের মালিক রুবেল মিয়া ও ম্যানেজার হাসেম মিয়ার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তবে তাদের কেউই ফোন রিসিভ করেননি।
লাইসেন্স দেওয়া দপ্তরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে
নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আশিকুর রহমান বলেন, মদের দোকানকে কেন্দ্র করে যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে কিংবা চুরি-ছিনতাই বেড়ে যায়, তাহলে পুলিশ অবশ্যই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
তবে তিনি বলেন, দোকানটির লাইসেন্স সরকারের একটি ভিন্ন দপ্তর ইস্যু করেছে। ফলে দোকানটি স্থানান্তর করা বা বন্ধ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সেই দপ্তরের।