
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে একের পর এক সামরিক কৌশল সামনে এনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ইরান। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ধারাবাহিক অভিযানে ইরানের অস্ত্রভান্ডারের নতুন একটি ড্রোন নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এর নাম ‘শাহেদ-২৩৮’।
কম খরচে তৈরি এই ড্রোনের উচ্চগতি ও আঘাত হানার সক্ষমতা আধুনিক বহুপর্দার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
শাহেদ-১৩৬ থেকে নতুন সংস্করণ
শাহেদ-২৩৮ তৈরি করা হয়েছে ইরানের বহুল ব্যবহৃত শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের ভিত্তিতে। তবে নতুন সংস্করণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে ইঞ্জিনে।
শাহেদ-১৩৬-এ যেখানে প্রপেলারচালিত পিস্টন ইঞ্জিন ব্যবহার করা হতো, সেখানে শাহেদ-২৩৮-এ বসানো হয়েছে শক্তিশালী ও কমপ্যাক্ট একটি টার্বোজেট ইঞ্জিন।
এই ইঞ্জিন পরিবর্তনের ফলেই ড্রোনটির গতিতে বড় ধরনের পার্থক্য এসেছে।
ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি
শাহেদ-২৩৮-এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এর গতি। পুরোনো শাহেদ-১৩৬ ঘণ্টায় প্রায় ১৮৫ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারত। বিপরীতে জেট ইঞ্জিনচালিত শাহেদ-২৩৮ ঘণ্টায় ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি তুলতে সক্ষম।
কিছু ক্ষেত্রে চূড়ান্ত আঘাতের সময় ড্রোনটির গতি ঘণ্টায় ৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রায় সাড়ে তিন মিটার দীর্ঘ এই ড্রোনটির ডানার বিস্তার তিন মিটার। এটি সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে পারে এবং ৫০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করার সক্ষমতা রয়েছে।
তবে পিস্টন ইঞ্জিনের পরিবর্তে জেট ইঞ্জিন ব্যবহারের কারণে এর জ্বালানি ধারণক্ষমতা ও উড্ডয়ন পাল্লা কিছুটা কমেছে। কিন্তু এর বিপরীতে গতি ও আঘাত হানার সক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়েছে। ফলে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া জানানোর সময়ও অত্যন্ত কমে এসেছে।
২০২৩ সালেই প্রকাশ্যে আসে ড্রোনটি
ইরানের ‘শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ’ ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো শাহেদ-২৩৮ ড্রোনটি প্রকাশ্যে আনে।
তবে ড্রোনটির প্রদর্শনীতেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকেনি। অল্প সময়ের মধ্যেই সীমিত পরিসরে এর উৎপাদন শুরু হয় এবং পরে যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি ব্যবহার করা হয়।
আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য কেন চ্যালেঞ্জ?
শাহেদ-২৩৮-এর উচ্চগতি প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। আধুনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইন্টারসেপ্টরগুলো মূলত তুলনামূলক ধীরগতির ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিহত করার সক্ষমতাকে সামনে রেখে তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু কোনো ড্রোন ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটার গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে এলে সেটি শনাক্ত করার পর প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারের হাতে সময় থাকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মতো।
শাহেদ-২৩৮-এ শত্রুপক্ষের রাডার নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য বিশেষ ইনফ্রারেড ও রাডার-হোমিং প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্রোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শত্রুর রাডার শনাক্ত করে সেটিকে লক্ষ্য করে আঘাত হানতে পারে।
কম খরচের ড্রোন, ব্যয়বহুল প্রতিরোধ
কৌশলগতভাবে শাহেদ-২৩৮কে ইরান অর্থনৈতিক যুদ্ধের একটি অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
একটি তুলনামূলক কম দামের শাহেদ-২৩৮ ধ্বংস করতে প্রতিপক্ষকে কোটি কোটি টাকা মূল্যের উচ্চমানের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এর পাশাপাশি, কোনো কোনো অভিযানে ধীরগতির শাহেদ-১৩৬-এর ঝাঁকের সঙ্গে দ্রুতগতির শাহেদ-২৩৮ একসঙ্গে ছোড়া হয়। এতে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ধরনের হুমকি মোকাবিলা করতে গিয়ে বিভ্রান্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাসে উৎপাদন হচ্ছে শত শত শাহেদ ড্রোন
বর্তমানে ইরানের কারখানাগুলোতে প্রতি মাসে শত শত শাহেদ ড্রোন তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ শাহেদ-২৩৮ বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে এই ড্রোন ইরানকে শেষ পর্যন্ত কতটা সাফল্য এনে দেবে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে স্বল্প ব্যয়ে তৈরি একটি ড্রোন কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে এবং এর উচ্চগতি কীভাবে কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অল্প সময়ের মধ্যে অকার্যকর করে দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে পারে—শাহেদ-২৩৮-এর মাধ্যমে ইরান সেই সম্ভাবনাই বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।
তথ্যসূত্র: প্রেস টিভি