
রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ মডেলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি এখনো ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধানতম রশদ। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যায়বহুল বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে নয়াদিল্লি। সেই উদ্যোগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ‘কুশা’।
ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডিআরডিও গত ২৩ জুলাই ওডিশা উপকূলের ড. এপিজে আবদুল কালাম দ্বীপ থেকে কুশার প্রথম উড্ডয়ন পরীক্ষা চালায়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, পরীক্ষায় নির্ধারিত আকাশ লক্ষ্যবস্তু সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। এই পরীক্ষাকে ভারতের স্বনির্ভর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কুশাকে শুধু নতুন একটি ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা হিসেবে দেখছে না ভারত। এটি ভবিষ্যতে দেশটির বহুস্তরীয় আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষিত ‘মিশন সুদর্শন চক্র’-এর আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিক স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও কৌশলগত সম্পদকে বিভিন্ন ধরনের আকাশ হুমকি থেকে সুরক্ষার লক্ষ্য রয়েছে।
ভারতের সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘদিন ধরেই রুশ অস্ত্র ও প্রযুক্তির বড় প্রভাব রয়েছে। যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, সাবমেরিন থেকে শুরু করে আকাশ প্রতিরক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরে রাশিয়া ছিল নয়াদিল্লির প্রধান সরবরাহকারী। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারতের আমদানি করা প্রধান অস্ত্রের ৪০ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে। এক দশক আগে এই হার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সময়ে ভারত ফ্রান্স, ইসরায়েলসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র উৎপাদনেও জোর দিয়েছে।
২০১৮ সালে ভারত প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পাঁচটি এস-৪০০ ব্যবস্থা কেনার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে। তবে সরবরাহে বিলম্ব এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ নয়াদিল্লিকে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
তবে কুশাকে এখনই এস-৪০০-এর বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং ভারত এমন একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে বিদেশি ও দেশীয় প্রযুক্তি পাশাপাশি কাজ করবে এবং কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকবে না।
এই উদ্যোগের পেছনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ দুটিই ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় বড় বিবেচ্য বিষয়।
তবে একটি সফল পরীক্ষাই কুশাকে পূর্ণাঙ্গ মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত এমনটি বলা যাবে না। আরও পরীক্ষা, মূল্যায়ন এবং বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের পরই এর প্রকৃত সক্ষমতা স্পষ্ট হবে।
তারপরও কুশার বার্তা পরিষ্কার; ভারত রাশিয়ার সঙ্গে পুরোনো প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেই এমন এক অবস্থানে যেতে চাইছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রব্যবস্থার জন্য তাকে কোনো একক বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করতে হবে না।