
তীব্র গরমের মধ্যেই ফেনীতে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই জেলার পাঁচ উপজেলা ও পৌর এলাকায় ১০০টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে, যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের চুরির সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ট্রান্সফরমার চুরির ফলে একদিকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদের, অন্যদিকে চুরি যাওয়া যন্ত্র প্রতিস্থাপনে বিদ্যুৎ বিভাগকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়ছে আর্থিক ক্ষতিও।
ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ১০০টি ট্রান্সফরমার খোয়া গেছে। এর মধ্যে ফেনী সদর উপজেলায় সর্বোচ্চ ৫৮টি, ছাগলনাইয়ায় ৩৬টি, পরশুরামে ৩টি, সোনাগাজীতে ২টি এবং দাগনভূঞায় ১টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, ট্রান্সফরমারের ভেতরের দামি তামার কয়েল ও তারের জন্যই মূলত চোরচক্র এসব যন্ত্রকে টার্গেট করছে। সাধারণত রাতের বেলায় নির্জন এলাকায় স্থাপিত ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যায় তারা। পরে সেখান থেকে তামার কয়েল ও তার বের করে বাকি অংশ ফেলে রাখা হয়।
ট্রান্সফরমার চুরি যাওয়ার পর নতুনটি বসানো না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষকে বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়। এতে বিশেষ করে গরমের সময়ে দুর্ভোগ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বিদ্যুৎ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ৫ কেভিএ ক্ষমতার একটি ট্রান্সফরমারের দাম প্রায় ৫৩ হাজার টাকা। ১০ কেভিএ ট্রান্সফরমারের মূল্য প্রায় ৮৩ হাজার টাকা, ১৫ কেভিএর দাম প্রায় ১ লাখ টাকা এবং ২৫ কেভিএ ট্রান্সফরমারের দাম প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা।
নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ট্রান্সফরমার প্রথমবার চুরি হলে সেটি প্রতিস্থাপনের জন্য নতুন ট্রান্সফরমারের মূল্যের ৫০ শতাংশ গ্রাহকদের পরিশোধ করতে হয়। একই ট্রান্সফরমার দ্বিতীয়বার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমারের সম্পূর্ণ মূল্যই গ্রাহকদের বহন করতে হয়। ফলে একই এলাকায় বারবার চুরি হলে বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয় গ্রাহকদের ওপর।
এদিকে একের পর এক চুরির ঘটনায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। প্রত্যন্ত ও জনবিচ্ছিন্ন স্থানে বসানো ট্রান্সফরমার নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন স্থানীয়রা। তারা চোরচক্রকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ট্রান্সফরমারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম (প্রশাসন) আবদুল আউয়াল বলেন, প্রতিটি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চুরি ঠেকাতে গ্রাহকদের সচেতন করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিংয়ের মাধ্যমে ট্রান্সফরমার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পাহারার বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ট্রান্সফরমার চুরি রোধে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সন্দেহজনক ব্যক্তিদের বিষয়ে বিদ্যুৎ অফিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিতে গ্রাহকদের বলা হচ্ছে।
ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় জেলার বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং চুরি হওয়া তারও উদ্ধার করা হয়েছে। চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গরমের সময়ে ট্রান্সফরমার চুরির কারণে গ্রাহকদের দুর্ভোগ বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই চোরচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যেসব স্থানে ট্রান্সফরমার বসানো হয়েছে, সেসব জায়গায় নিরাপত্তা জোরদার করাও জরুরি।