
দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার জেরে এবার ভারতের লোকসভায় নতুন করে রাজনৈতিক ঝড় উঠেছে। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
বুধবার সংসদে প্রশ্নফাঁসবিরোধী বিলসংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি করেন, এ ঘটনায় সংসদ কক্ষে তুমুল হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।
পার্লামেন্টে নিজের বক্তব্য তুলে ধরে রাহুল গান্ধী দাবি করেন, দিল্লির যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদরত শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো পুলিশি অভিযানের অনুমোদন এসেছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তর থেকে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধ করতে বলপ্রয়োগ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সংসদে উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশে তিনি এই ঘটনার জবাবদিহি দাবি করেন।
রাহুলের এমন মন্তব্যের পরপরই গর্জে ওঠেন ক্ষমতাসীন জোটের আইনপ্রণেতারা। তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তারা বিরোধীদলীয় নেতার কাছে এই গুরুতর দাবির সত্যতা প্রমাণের দাবি জানান। সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, এমন গুরুতর অভিযোগের পক্ষে অবশ্যই প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। ক্ষমতাসীন বিজেপি ও এনডিএ শিবিরের অভিযোগ—কোনো প্রকার উপযুক্ত নথি বা সাক্ষ্য ছাড়াই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো শীর্ষ পদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন রাহুল গান্ধী। তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে সভার কার্যক্রম সাময়িকভাবে থমকে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে হস্তক্ষেপ করেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। তিনি রাহুল গান্ধীকে মনে করিয়ে দেন, সংসদে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে হলে তার পক্ষে যথাযথ তথ্য ও প্রমাণ থাকতে হবে। একই সঙ্গে স্পিকার উপস্থিত সব সদস্যকে শান্ত থাকার নির্দেশ দেন।
সংসদে তৈরি হওয়া এই উত্তাপের গোড়াপত্তন ঘটেছিল গত ২০ জুলাই। প্রশ্নফাঁস রোধ, শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে এক বিশাল বিক্ষোভের আয়োজন করে শিক্ষার্থীরা। পরে আন্দোলনকারীরা সংসদের দিকে পা বাড়ালে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে, যাতে অনেক শিক্ষার্থী আঘাত পান। অনলাইনভিত্তিক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এই কর্মসূচির নেপথ্যে ছিল এবং বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকও এতে সংহতি প্রকাশ করেন। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিল পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি দমন এবং সরকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংলাপ।
এই ইস্যু নিয়ে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এক চিঠিতে চেপে ধরেছিলেন রাহুল গান্ধী। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের তীব্র সমালোচনা করে তিনি জানতে চান—কাঁদানে গ্যাস ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ কার তরফ থেকে এসেছিল এবং শত শত শিক্ষার্থী আহত হওয়ার দায় কার।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে রাহুলের এসব দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিজেপি নেতাদের ভাষ্য, কেবল শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার খাতিরেই পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছিল। বিরোধী দল এই ইস্যু নিয়ে নোংরা রাজনীতি করছে বলেও তারা তোপ দাগেন।
শিক্ষার্থীদের এই রাজপথের লড়াই রাজনীতির মাঠে এতটাই প্রভাব ফেলেছে যে, ইতিপূর্বে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। পদত্যাগের সময় তিনি বলেন, আন্দোলনকে কোনো দেশবিরোধী শক্তি যাতে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সেই দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, রাজপথের ছাত্র আন্দোলন এখন পুরোপুরি নয়াদিল্লির সংসদীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী দিনগুলোতে শিক্ষা ব্যবস্থার এই অচলাবস্থা ও পুলিশি অ্যাকশন নিয়ে সরকার ও বিরোধী শিবিরের মধ্যকার যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।