
বিয়ের সানাইয়ের সুর তখনও হয়তো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। মধুর দাম্পত্যের বয়স মোটে আটচল্লিশ দিন—বছরের হিসেবে যা এক-ষষ্ঠাংশের চেয়েও সামান্য এক ক্ষণস্থায়ী অধ্যায়। কিন্তু মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ের এই বৈবাহিক জীবনে ভারতের ২৬ বছর বয়সী তরুণী বিশাখা তিলকরের কপালে জুটেছিল এক বিভীষিকাময় নরকযন্ত্রণা। চিকিৎসক স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ধারাবাহিক ও অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন এই গৃহবধূ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি সূত্রে জানা গেছে, ভারতের মুম্বাই সংলগ্ন থানের আম্বরনাথ এলাকায় স্বামী নিতিন তিলকরের সঙ্গে একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন বিশাখা।
বিশাখার বাবা-মায়ের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তার ওপর কেবল শারীরিক প্রহারই চালানো হয়নি, বরং সুপরিকল্পিতভাবে তীব্র মানসিক ও চরম নিষ্ঠুরতার মধ্য দিয়ে তার জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলা হয়েছিল। আম্বরনাথের পুরো বাড়িটির ভেতর ও বাইরের অংশ সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন পেশায় চিকিৎসক স্বামী নিতিন। বিশাখার প্রতিটি পদক্ষেপ ও চলাফেরার ওপর এই ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক কড়া নজরদারি চালানো হতো, যার ফলে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার শেষ অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
পারিবারিক সম্মতিতে গত ৩০ এপ্রিল ধুমধাম করে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। বিয়ের আগে পাত্রপক্ষ স্বাভাবিক আচরণ করলেও, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়া মাত্রই তাদের রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায় বলে বিশাখার স্বজনরা জানান। তাদের দাবি, বিয়েতে চাহিদা অনুযায়ী যৌতুক ও দামি উপহার সামগ্রী এবং আশানুরূপ ‘রাজকীয় মর্যাদা’ না পাওয়ায় প্রথম থেকেই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিল শ্বশুরবাড়ির লোকজন।
নিহত বিশাখার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এই পাশবিকতার বর্ণনা দিয়ে বলেন,
‘বাপের বাড়ি থেকে অনবরত টাকা ও গহনা নিয়ে আসার জন্য বিশাখাকে চাপ দেওয়া হতো।’
লোমহর্ষক এই নজরদারির বিষয়ে তার ভাষ্য,
‘নিতিন ঘরে-বাইরে সিসিটিভি লাগিয়ে বিশাখার প্রতি মুহূর্তের গতিবিধি নজরদারি করত। সে কারো সঙ্গে কথা বললেই বাড়ি ফেরার পর তার ওপর চলত অমানুষিক নির্যাতন। মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগেও একজন নারী প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলার অপরাধে তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। এই চরম হতাশা ও অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সে নিজের জীবনই শেষ করে দেয়।’
জানা গেছে, চরম এই আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে বিশাখা তার মায়ের কাছে ফোনে কেঁদে কেঁদে এই অবর্ণনীয় নির্যাতনের কথা খুলে বলেছিলেন। মেয়ের মুখে এই দুরবস্থার কথা শুনে ব্যাকুল বাবা-মা তাকে অতি দ্রুত নিজেদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই সুযোগ আর মেলেনি; শ্বশুরবাড়ি থেকে উদ্ধার করার আগেই বিশাখা নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে খবর পান তারা।
এই মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় আম্বরনাথের শিবাজিনগর থানায় নিহতের স্বামী নিতিন তিলকর, শাশুড়ি ছায়া এবং দেবর নিনাদের বিরুদ্ধে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনসহ আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মূল অভিযুক্ত স্বামী নিতিনকে ইতিমধ্যে পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে এবং মামলার বাকি দুই আসামিকে আইনের আওতায় আনতে বিভিন্ন স্থানে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।