
দেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যে ঘেরা সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের এক যুগ পার হলেও আলোর মুখ দেখেনি এর তদন্ত। এই নির্মম জোড়া খুনের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত সূচি আরও একবার পিছিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২২ জুলাই প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন ঠিক করা হয়েছে। এ নিয়ে চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্ত রিপোর্ট পেশের সময়সীমা রেকর্ড ১২৭ বারের মতো পেছাল।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুরে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত তদন্ত প্রতিবেদন জমার জন্য নতুন এই তারিখ নির্ধারণ করেন।
আদালত সূত্র জানায়, আজ বৃহস্পতিবার মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে ব্যর্থ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক তদন্তভার সচল রেখে নতুন করে এই সময়সীমা বেঁধে দেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
ফিরে দেখা ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায়: ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের একটি ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। হত্যাকাণ্ডের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে ওই ফ্ল্যাটে অবরুদ্ধ ছিল এই দম্পতির সাড়ে চার বছরের একমাত্র শিশুসন্তান মাহির সরওয়ার মেঘ।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর নিহত রুনির ছোট ভাই নওশের আলম রোমান বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার নথিতে মোট আটজনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন— রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, বাড়ির দুই নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তাদের ‘বন্ধু’ তানভীর রহমান খান। বর্তমানে আসামিদের মধ্যে তানভীর ও পলাশ জামিনে মুক্ত থাকলেও বাকিরা কারাগারেই বন্দি রয়েছেন।
তদন্ত সংস্থার রদবদল ও উচ্চ আদালতের নির্দেশ: শুরুতে মামলাটির প্রাথমিক তদন্তের দায়িত্ব সামলায় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। তবে মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে পরবর্তীতে এর তদন্তভার ন্যস্ত করা হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) ওপর। সেখানেও কোনো কূলকিনারা না হওয়ায় আদালতের নির্দেশে এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) তদন্তের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পায়।
দীর্ঘদিনেও র্যাব কোনো চূড়ান্ত কূলকিনারা করতে না পারায়, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী আদেশে মামলাটির তদন্তভার র্যাব থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব উল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করে মামলাটি তদন্তের আদেশ জারি করেন।
উচ্চ আদালতের সেই কঠোর নির্দেশনার আলোকেই গত বছরের ২৩ অক্টোবর চার সদস্য বিশিষ্ট একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে সরকার। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধানকে এই গুরুত্বপূর্ণ টাস্কফোর্সের প্রধান বা আহ্বায়ক করা হয়। তবে টাস্কফোর্স গঠনের পরও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দীর্ঘসূত্রতা কাটেনি, যা আজ ১২৭ তম বারের মতো পেছানোর মধ্য দিয়ে আরও একবার প্রমাণিত হলো।