
পদ্মা সেতুর পিলারের চারপাশ থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়ার একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া তীব্র উদ্বেগ ও বিভ্রান্তিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন সরকার। সড়ক পরিবহন, সেতু, নৌপরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম স্পষ্ট জানিয়েছেন, যা অপসারণ করা হচ্ছে তা মূলত মূল সেতুর কাঠামোর কোনো অংশ নয়, বরং নির্মাণকাজের স্বার্থে নদী তীরে সাময়িকভাবে ভরাট করা মাটি মাত্র।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুরে সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত এক সংলাপে গণমাধ্যমকর্মীদের সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে সেতুমন্ত্রী এই ব্যাখ্যা দেন।
তিনি জানান, বিষয়টি নজরে আসার পরপরই তিনি নিজে এর গভীর অনুসন্ধান করেছেন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে বিস্তর কথা বলেছেন। তাদের প্রযুক্তিগত মতামত বিশ্লেষণ করে মন্ত্রী নিশ্চিত করেন যে, এই মাটি সরানোর ফলে মূল সেতুর স্থায়িত্ব বা নিরাপত্তার ওপর কোনো ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা নেই।
উদ্ভূত পরিস্থিতি স্পষ্ট করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘যে মাটি সরানো হচ্ছে, তা সেতুর মূল কাঠামোর অংশে নয়। নির্মাণকাজ পরিচালনার সুবিধার জন্য নদীর দুই তীরের কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে মাটি ভরাট করা হয়েছিল। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরই সেগুলো সরিয়ে ফেলার কথা ছিল।’
তিনি আরও জানান, যেকোনো মেগা প্রজেক্ট বা বড় অবকাঠামো নির্মাণকালে ভারী যন্ত্রপাতি, খণ্ড খণ্ড নির্মাণসামগ্রী এবং বিশাল যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে নদীর তীরের কিছু অংশে অস্থায়ীভাবে এভাবে মাটি ভরাট বা কৃত্রিম রাস্তা তৈরি করতে হয়। স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের সময়েও প্রকৌশলগত কারণে একই আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল।
শেখ রবিউল আলম উল্লেখ করেন, ঠিকাদারি চুক্তির মূল শর্তের মধ্যেই কাজ শেষে এই অতিরিক্ত ভরাট করা মাটি সম্পূর্ণ অপসারণ করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক ছিল এবং এর জন্য নির্দিষ্ট আর্থিক বরাদ্দও রাখা হয়েছিল। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সময়মতো সেই মাটি না সরানোয় বিগত কয়েক বছরে সেখানে প্রাকৃতিকভাবে ঘাস ও লতাপাতা জন্মে যায়, যা দেখতে একদম স্বাভাবিক মাটির স্তূপ বা নদীর পাড়ের মতো মনে হচ্ছিল।
প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরে তার ভাষায়, ‘এখন মাটি অপসারণ শুরু হওয়ায় অনেকের মনে হচ্ছে পিলারের গোড়া থেকে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে সেতুর পাইল বা মূল কাঠামোর সঙ্গে এ মাটির কোনো সম্পর্ক নেই।’
তিনি আরও যোগ করেন, ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা সমীক্ষার নিয়মানুযায়ী পদ্মার প্রাকৃতিক প্রবাহ, নদীর নাব্যতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং পানি চলাচলের পথ পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখতেই এই ভরাটকৃত বাড়তি মাটি এতদিনে অপসারণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
উক্ত সংলাপে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং বাস কাউন্টার ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, যাত্রীসাধারণের নাগরিক সেবার মান বাড়াতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত অপেক্ষাকক্ষ, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা ও উন্নত টয়লেট সুবিধা নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকাকে যানজটমুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে ঢাকার বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে স্থানান্তর করা হবে। মহাখালী টার্মিনালের জন্য উত্তরা সংলগ্ন এলাকায় জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সায়েদাবাদ টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে এবং গাবতলী টার্মিনালের জন্য ৩০০ ফুট এলাকায় ডিপো উন্নয়নের কাজ চলছে।
একই সঙ্গে রুটভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি বা নির্দিষ্ট কোম্পানি ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে রাজধানীর চিরচেনা বাস ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। মন্ত্রীর মতে, একই রুটে অসংখ্য ব্যক্তি মালিকানাধীন গণপরিবহন ও বাস চলায় চালকদের মাঝে অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা ও তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
সেতু ও রেলমন্ত্রী আরও জানান, ঢাকার মেট্রোরেল, বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাস এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েকে সমন্বিত করে একটি ছাতার নিচে ‘মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা’ গড়ে তুলছে সরকার। পাশাপাশি মহানগরের যানজট কমাতে ঢাকাকেন্দ্রিক কমিউটার ট্রেন নেটওয়ার্কও দূরপাল্লায় সম্প্রসারণের মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে।