
শৈশবে মরণব্যাধির চিকিৎসার কবলে পড়ে প্রজনন ক্ষমতা হারানো পুরুষদের জন্য আশার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান। এক যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধির আগে সংরক্ষণ করে রাখা অণ্ডকোষের টিস্যু দীর্ঘ ১৬ বছর পর পুনরায় শরীরে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এক ব্যক্তি আবারও শুক্রাণু উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন।
চিকিৎসা ইতিহাসের প্রথম মাইলফলক
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে শৈশবে হিমায়িত করে রাখা টিস্যু ব্যবহারের মাধ্যমে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রজনন ক্ষমতা আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে ২৭ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি মাত্র ১০ বছর বয়সে ‘সিকেল সেল’ রোগে আক্রান্ত হয়ে উচ্চমাত্রার কেমোথেরাপি নিয়েছিলেন, যার ফলে তিনি স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।
যেভাবে এলো এই সাফল্য
২০ বছর আগে যখন এই গবেষণা শুরু হয়, তখন এটি ছিল অনেকটা অনিশ্চিত এক যাত্রা। ২০০২ সালে বেলজিয়ামের একটি ক্লিনিকে প্রথমবারের মতো শিশুদের অণ্ডকোষের টিস্যু সংরক্ষণের এই ‘টিস্যু ব্যাংকিং’ কার্যক্রম শুরু হয়। বেলজিয়ামের ‘ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলস’-এর অধ্যাপক এলেন গুসেনস এই সাফল্যের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এই সাফল্যের ফলে আরও অনেক মানুষ এখন নিজেদের সন্তান লাভের স্বপ্ন দেখতে পারবেন। বিশেষ করে যেসব রোগীর টিস্যু আগে থেকেই প্রজনন ব্যাংকে সংরক্ষিত রয়েছে, তাদের জন্য এটি নতুন আশার আলো।’
জটিল প্রক্রিয়া ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
সাধারণত বয়ঃসন্ধির আগে শিশুদের শরীরে শুক্রাণু তৈরি হয় না, ফলে তাদের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইভিএফ পদ্ধতির জন্য শুক্রাণু সংরক্ষণের সুযোগ থাকে না। তবে অণ্ডকোষের অপরিণত টিস্যুতে থাকা বিশেষ স্টেম সেল ভবিষ্যতে শুক্রাণু তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
২০০৮ সালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ওই রোগীর অণ্ডকোষের টিস্যু সংগ্রহ করে হিমায়িত করা হয়। গত বছর চিকিৎসকরা সেই সংরক্ষিত টিস্যুর কিছু অংশ তার শরীরে পুনরায় প্রতিস্থাপন করেন। এক বছর পর দেখা যায়, অণ্ডকোষের ভেতরে স্থাপন করা টিস্যু থেকে পরিপক্ক শুক্রাণু উৎপন্ন হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে; যেহেতু টিস্যুগুলো সরাসরি শুক্রাণু নালীর সঙ্গে যুক্ত নয়, তাই স্বাভাবিক প্রজনন সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে আইভিএফ পদ্ধতিই হবে একমাত্র ভরসা। অধ্যাপক গুসেনস আরও বলেন, ‘সংগ্রহ করা শুক্রাণুগুলো দেখতে স্বাভাবিক ছিল। তবে এগুলো ডিম্বাণু নিষিক্ত করতে সক্ষম কি না, সেটি এখনও পরীক্ষা করে দেখা বাকি।’
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে সম্ভাবনা
এই অভাবনীয় সাফল্যকে ‘নীতিগত সাফল্যের প্রমাণ’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরা’র অধ্যাপক রড মিচেল, যিনি নিজেও একই ধরনের গবেষণা চালাচ্ছেন, তিনি বলেন, ‘মানুষের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে— এখন তার বাস্তব প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটি সত্যিই বিস্ময়কর।’
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি রোগীর অণ্ডকোষের টিস্যু বিভিন্ন প্রজনন ব্যাংকে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতি বছর শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যেই প্রায় ২০০ জন রোগী এই প্রযুক্তির মাধ্যমে উপকৃত হতে পারবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২৭ বছর বয়সী ওই তরুণ এখন তার জীবনের নতুন অধ্যায় অর্থাৎ বাবা হওয়ার স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।