
দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী বর্তমানে থাইরয়েড হরমোনজনিত জটিলতায় আক্রান্ত, যার একটি বড় অংশই নারী ও শিশু। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ এই নীরব ঘাতক ব্যাধিতে ভুগলেও সচেতনতার অভাবে ৬০ শতাংশই চিকিৎসার আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে পরিবারের একজনের থাইরয়েড ধরা পড়লে বাকি সদস্যদেরও স্ক্রিনিং করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
থাইরয়েড মেলা ও সচেতনতা সপ্তাহ
বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজধানীর ধানমন্ডিতে ‘বিশ্ব থাইরয়েড দিবস-২০২৬’ ও ‘আন্তর্জাতিক থাইরয়েড সচেতনতা সপ্তাহ’ উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. ফরিদুল আলম প্রধান অতিথি হিসেবে চার দিনব্যাপী ‘থাইরয়েড মেলা’র উদ্বোধন করেন।
বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. এ.কে.এম ফজলুল বারীর সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির মহাসচিব ডা. শাহজাদা সেলিম।
নারী ও শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
বিশেষজ্ঞরা জানান, থাইরয়েড আক্রান্তদের প্রতি ৫ জনের মধ্যে ৩ জনই নারী। এছাড়া প্রতি ২৩০০ নবজাতকের মধ্যে একজন জন্মগতভাবে এ সমস্যায় ভুগছে। বংশগতির প্রভাব তুলে ধরে অধ্যাপক ডা. এ.কে.এম ফজলুল বারী বলেন, "গবেষণায় দেখা গেছে যে, থাইরয়েড রোগ বিস্তারে বংশগতির প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে দাদী, নানী বা মায়ের থাইরয়েডে সমস্যা থাকলে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের ও আত্মীয়স্বজনদের থাইরয়েড সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।"
কখন পরীক্ষা করা জরুরি?
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, মায়েদের গর্ভধারণের আগে, শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর, বয়ঃসন্ধিকালে এবং বয়স ৪০ পার হলে থাইরয়েড পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। এছাড়া ওজন পরিবর্তন, অতিরিক্ত ঘাম, শীত বা গরমে অতি সংবেদনশীলতা, চুল পড়া, বুক ধড়ফড় করা, অনিয়মিত মাসিক বা গর্ভপাতের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে বলা হয়েছে।
ডা. শাহজাদা সেলিম সতর্ক করে বলেন, "থাইরয়েড একটি নীরব ঘাতক। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা লক্ষণগুলোকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন, ফলে রোগটি দীর্ঘদিন অজানা থেকে যায় এবং পরে গুরুতর আকার ধারণ করে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।"
মেলার বিশেষ সুবিধা ও সেবা
জনসচেতনতা বাড়াতে ‘দি থাইরয়েড সেন্টার’ ও ‘বিটমি’ প্রায় দুই দশক ধরে কাজ করছে। এবারের চার দিনব্যাপী মেলায় প্রায় ৩ হাজার রোগীকে সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হবে। মেলার উল্লেখযোগ্য অফারগুলো হলো:
বিনামূল্যে চিকিৎসা: ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য।
বিশেষ ছাড়: থাইরয়েড হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য ৫০ শতাংশ এবং থাইরয়েড টিউমার/ক্যানসারের আধুনিক চিকিৎসায় (লেজার ও আরএফএ) ২৫ শতাংশ ছাড়।
সাশ্রয়ী প্যাকেজ: মাত্র ৩৫০০ টাকায় রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ব্লাড গ্রুপ নির্ণয়সহ পূর্ণাঙ্গ চেকআপ।
পরামর্শ ফি: অধ্যাপক ও কনসালটেন্ট চিকিৎসকরা মাত্র ৫০০ টাকায় রোগী দেখছেন।
বাংলাদেশে থাইরয়েড ক্যানসার ও জটিল রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সেই তুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনও অপ্রতুল বলে সভায় মত প্রকাশ করা হয়। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন চিকিৎসকরা।