
ঠাকুরগাঁওয়ে ২০১১ সালে সংঘটিত এক শিশু ধর্ষণ মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তিন আসামিকে প্রাকৃতিক মৃত্যু পর্যন্ত আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিনজনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি ছয় দণ্ডিতের প্রত্যেককে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। আদালত আদেশ দিয়েছেন, আদায় করা অর্থ ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করতে হবে।
রোববার (১৯ জুলাই) ঠাকুরগাঁওয়ের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আলী মনসুর বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর সন্ধ্যায় এক কিশোরী বাড়ি ফেরার পথে কয়েকজন যুবকের হাতে যৌন সহিংসতার শিকার হন। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে ২৫ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযোগপত্র দাখিল করলে মামলার বিচার শুরু হয়।
দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ, আলামত উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায় দেন।
রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(৩) ধারায় মো. আনিছ ওরফে রানা, মো. সাইফুল ইসলাম ও মো. দুলালকে দোষী সাব্যস্ত করে প্রাকৃতিক মৃত্যু পর্যন্ত আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁদের প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে।
এ ছাড়া একই আইনের ৯(৩)/৩০ ধারায় মো. আনিছুর, মো. খতিবুর ওরফে খতু এবং মো. লালুকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ বিচারাধীন অবস্থায় হাজতে কাটানো সময় তাঁদের সাজা থেকে সমন্বয় করা হবে না। এছাড়া তাঁরা জেল কোড অনুযায়ী সাজা মওকুফ বা রেমিশনের সুবিধাও পাবেন না।
অন্যদিকে, যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি আইন অনুযায়ী ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা পাবেন।
আদালত আরও নির্দেশ দেন, দণ্ডিতদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে। অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাঁদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায় কার্যকরের অংশ হিসেবে পাঁচ দণ্ডিতকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। তবে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. আনিছ ওরফে রানা পলাতক থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আদালত বলেন, গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের পর থেকে তাঁর সাজা কার্যকর হবে।
রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বদরুল চৌধুরী বলেন, আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতে এ রায় দিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর হলেও ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেয়েছেন। এ রায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।