
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে আয়োজন করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়াই ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর আওতায় ওই গণভোট চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
রোববার (১৯ জুলাই) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে গণঅধিকার পরিষদ আয়োজিত ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটটি সাংবিধানিক ছিল না। ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর ভিত্তিতে চারটি বিষয়ে একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের সুযোগ রেখে গণভোট আয়োজন করা হয়েছিল, যা রাজনৈতিক সমঝোতার চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
তিনি বলেন, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কি না, তা জানতে চাইলে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে গণভোট আয়োজনই যথাযথ হতো।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত কয়েকটি কমিশনের সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কিছু কমিশন গঠন করা হয়েছিল নির্দিষ্ট কাজের পরিবর্তে কয়েকজন ব্যক্তির কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তি বা তাদের পরিবারের জন্য কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থাও সেখানে স্পষ্ট ছিল না।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও দেশের সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় আগামী সংসদ অধিবেশনে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘গুম প্রতিরোধ আইন’ আনা হবে। এতে গুমের সংজ্ঞা, অপরাধের ধরন, শাস্তি এবং বিচারিক এখতিয়ার সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের আইনও যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে মানবাধিকার আইনে দেশের ধর্মীয়, সামাজিক মূল্যবোধ ও জাতীয় সংহতির বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যের শুরুতে মব জাস্টিসের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মব কখনোই জাস্টিস হতে পারে না। এটি একটি অপসংস্কৃতি। আইনের শাসন দুর্বল হওয়ার কারণেই এ ধরনের সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমেই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিচার বিভাগের একটি অংশ এখনো রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা প্রায় ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অল্প কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশই বর্তমান সরকার আইনে রূপান্তর করেছে। তবে রাষ্ট্রকাঠামোর স্থায়ী সংস্কারের জন্য সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন।
সংবিধানকে একটি পরিবর্তনশীল দলিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান ফিরে এসেছে। তবে সংবিধানের প্রস্তাবনা বা মৌলিক বিধান সংশোধনের জন্য রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে যে গণভোটের প্রয়োজন, আলোচিত গণভোট সেটি ছিল না।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং আবু সাঈদসহ অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্টের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ১৯ জুলাই সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যারা শুধু মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে জুলাইয়ের চেতনাকে ব্যবহার করছেন, তাদের পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় রাজনীতির ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসান এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাসির উদ্দিনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব বক্তব্য দেন।