
প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফেরার পথে ৯ বছরের এক ফুটফুটে শিশুকে তুলে নিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা এবং পরে লাশ গুম করে উল্টো বাবার কাছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি—শোনা মাত্রই গা শিউরে ওঠা এই নৃশংস অপরাধের প্রধান অভিযুক্তকে অবশেষে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন আদালত। টাঙ্গাইলের সখিপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া আক্তারকে বর্বরোচিতভাবে অপহরণ ও খুনের দায়ে সাব্বির মিয়া নামের এক যুবকের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আ ন ম ইলিয়াস এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। পরে কড়া নিরাপত্তায় তাঁকে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
জঙ্গলে নিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা ও লাশ গুম
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাব্বির মিয়া (২১) টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার দাড়িয়াপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে। অন্যদিকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু সামিয়া আক্তার (৯) দাড়িয়াপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ও একই গ্রামের রনজু মিয়ার কন্যা।
মামলার বিবরণ ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) মো. ওমরাও খান দীপুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে প্রাইভেট পড়া শেষে বাড়ি ফিরছিল শিশু সামিয়া। পথিমধ্যে সাব্বির তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে পাশের একটি নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যান। সামিয়া নিজেকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ ধস্তাধস্তি ও চিৎকার শুরু করলে ক্ষুব্ধ সাব্বির তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর লাশ আড়াল করার উদ্দেশ্যে পাশের একটি ধানখেতের ড্রেনে নিয়ে কাঁদামাটি চাপা দিয়ে রাখেন।
ইমুতে মুক্তিপণ দাবি ও অবশেষে পুলিশের জালে ধরা
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর নিজের পরিচয় পুরোপুরি গোপন রাখতে একটি ভুয়া ‘ইমু’ (Imo) অ্যাকাউন্ট খোলেন সাব্বির। এরপর সামিয়ার বাবার মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করতে থাকেন। এই ঘটনায় পরদিন ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সামিয়ার পিতা রনজু মিয়া বাদী হয়ে সখিপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা রুজুর পরদিনই (৮ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সেই ধানখেতের ড্রেন থেকে সামিয়ার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মূল হোতা সাব্বিরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। পুলিশের জেরার মুখে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে সাব্বির আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করেন।
একাধিক ধারায় যত শাস্তি
আদালতের শুনানিতে আসামির বিরুদ্ধে আনা সব কটি অপরাধের অকাট্য প্রমাণ মেলে। ফলে বিচারক খুনের অপরাধে সাব্বিরকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
এর পাশাপাশি অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে অন্যান্য ধারায় সাজা ঘোষণা করা হয়:
অপহরণের দায়ে: ১৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা।
মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে আটকে রাখায়: যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৩০ হাজার টাকা জরিমানা।
লাশ গুম ও আলামত ধ্বংসের দায়ে (কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা): ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন পিপি মো. ওমরাও খান দীপু এবং আসামিপক্ষে আইনি লড়াইয়ে নিয়োজিত ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন।