
মাঠের লড়াই যতটা উত্তেজনা ছড়ায়, ক্রীড়া প্রশাসনের অন্দরমহল ততটাই নীরব কিন্তু আলোচিত। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের ভেতরে কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন ঘিরে যে বিতর্ক সামনে এসেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম, অভিযোগ এবং অদৃশ্য প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলো এখন ক্রীড়াঙ্গনের আলোচনার প্রধান ইস্যু। বিষয়টি কেবল সাংগঠনিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ক্রীড়া প্রশাসনের গভীর কাঠামোগত বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্রীড়া মহলের একাধিক সূত্রের অভিযোগ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দায়িত্বকালীন সময়ে কয়েকটি ফেডারেশনে কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানো হয়েছিল। অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর কথাও উঠে এসেছে আলোচনায়। যদিও এসব অভিযোগের আনুষ্ঠানিক কোনো নিষ্পত্তি হয়নি, তবুও ক্রীড়াঙ্গনে বিষয়টি স্থায়ী আলোচনার অংশ হয়ে রয়েছে।
বিশেষ করে কমিটি গঠনে একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল বলে সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সজীবের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্টাফ মাহফুজ আলম এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের একান্ত সচিব সাইফুল ইসলাম বিভিন্ন ফেডারেশনে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। ক্রীড়াসংশ্লিষ্টদের দাবি, কখনো রাজনৈতিক প্রভাব, কখনো আর্থিক লেনদেন, আবার কখনো ব্যক্তিগত যোগাযোগের জোরে সিদ্ধান্ত দ্রুত অনুমোদন পেত। ফলে গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার চেয়ে প্রভাবশালী বলয়ের গুরুত্ব বেশি হয়ে উঠেছিল।
বাংলাদেশের ক্রীড়া অঙ্গনে কমিটি-কেন্দ্রিক রাজনীতি নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একই ধরনের অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে সামনে আসায় অনেকে এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি প্রবণতা হিসেবে দেখছেন।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সাবেক সচিব আমিনুল ইসলাম এবং বর্তমান পরিচালক (ক্রীড়া) আমিনুল এহসানের ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া কোনো ফেডারেশনের কমিটি পরিবর্তন সম্ভব নয়। ফলে তাদের সমর্থন ছাড়া পুনর্গঠন কার্যত বাস্তবায়ন হতো না বলে ক্রীড়া মহলে আলোচনা রয়েছে। এ কারণে প্রশাসনিক দায় ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ফেডারেশনগুলোর ভেতরের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে অনেক কর্মকর্তা, খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্টরা অস্বস্তিকর বাস্তবতার কথা বলেছেন। সীমিত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মনোনয়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খেলোয়াড় ও কোচদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে বলেও দাবি করেছেন অনেকে। ফলে কিছু ফেডারেশন ধীরে ধীরে খেলাধুলার উন্নয়নকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
নির্বাচনের পর এখন পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। কয়েকটি ফেডারেশনে পদত্যাগ, পুনর্গঠন এবং নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। এর পেছনের কারণ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ বলছেন প্রশাসনিক চাপ, কেউ দেখছেন রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন, আবার অনেকে মনে করছেন দীর্ঘদিনের অসংগতির স্বাভাবিক পরিণতিই এখন দৃশ্যমান।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রশাসন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। মাঠের সাফল্য যেমন সাময়িক উচ্ছ্বাস আনে, তেমনি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলেই সম্ভব টেকসই উন্নয়ন। এখন দেখার বিষয়, চলমান এই পরিবর্তন কেবল সাময়িক আলোড়ন হয়ে থাকে, নাকি সত্যিই নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা ঘটায়।